নাটক
Trending

আমরা সবাই রাজা

রচনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নাট্যরুপ: তৌফিক হাসান ময়না

রবীন্দ্রনাথের “আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজার রাজত্বে” গানের সুর বেজে ওঠে। ধীরে ধীরে কথক এসে দাঁড়ায়।
কথক।। ওগো, এ কোথায় এনে ফেললো গো। রঙ্গমঞ্চ ফিটফাট, দৃশ্যপটও উন্মেচিত, অপেক্ষারত বসে সারি সারি মানুষের কৌতুহলী চোখ। বন্ধু প্রিয়, এ কোন সাগরে এনে ফেললো গো। এ কোন গুরুদায়িত্ব অর্পিত হলো আমার কাঁধে।
দেখতে হবে জমাট গল্প, ঘটাতে হবে তমুল কান্ড। ব্যাকুল দর্শক কুল মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে দেখবে চিত্তহারী দৃশ্য কাব্য। গোটা রঙ্গমঞ্চে মুহমুহ করতালি। আনন্দে উড়িয়ে দেবে কল্পনার ঘোড়া।
অতএব বিলম্ব কিসের, মঞ্চস্থ হোক দৃশ্যকাব্য-উন্মেচিত হোক দৃশ্যাবলী। শুরু হোক অভিনব নাট্যকলার আশ্চর্য কথন। কবিতার কল্পবৃক্ষে ফটুক মুকুল।
সুধীজন
উজ্জল, আলোকার্দীন এই দৃশ্যপট রঙ্গমঞ্চে আজ মঞ্চস্থ হবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই বিঘা জমি আর সামন্য ক্ষতি কবিতা নিয়ে রচিত নাটক আমরা সবাই রাজা।
রবীন্দ্রনাথ, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ডালপালা ছড়ানো এক বিশাল বটবৃক্ষ। তার ছায়ায় আমরা।
এমন সময় রাজার আসার সূর বেজে ওঠে। রাজা আসে। পিছনে আরো সভাসদ আগে বসে থাকে।
রাজা : (কথকে দেখে) এই যে শিল্পী, কি করছো এখানে ?
কথক : না মানে-গল্প-
রাজা : চলো, আমার দরবারে চলো-শুনবো তোমার আনন্দ সুন্দর কথন।
(দুইজন ঘুরে রাজদরবারে যায়। সভাসদ সহ রাজা সিংহাসনে বসে।
সভাসদবৃন্দ : মহারাজের জয় হোক, কল্যাণ হোক, মঙ্গল হোক।
রাজা : শান্ত-শান্ত-শান্ত
ঈশ্বর, তোমাদের সকলেকে ভাল রাখুক।
শুভ হোক তোমাদের জীবন।
সভাসদ: বিরাট রাজ্যের রাজা হরিশচন্দ্র রায় চৌধুরী
দীর্ঘজীবি হোক
প্রজা হিতৌষী রাজা
জয় হোক, জয় হোক
রাজা : প্রীত, প্রীত আমি। তোমাদের আনন্দে সুপ্তির অতলে ওঠে গান। মধুর সংগীত বেজে ওঠে ছন্দিত সুরে সুরে।
১ নং সভাসদ: তবে হয়ে যাক মধুর গীত, সংগীতের রসে পুষ্পবৃত্তে ফটুক কলি।
সভাসদ বৃন্দ : ঠিক ঠিক ঠিক।
রাজা : নাচ গান মন্ত্রী
মন্ত্রী : মহারাজ আজ্ঞা করুন।
রাজা: শুরু কর-শুরু কর-আর বিলম্ব কেন ?
সভাস : ঠিক-বিলম্ব কেন ?
১ নং সভাসদ : সর্বাগ্রে নৃত্যগীত
মন্ত্রী : ওগো নৃত্য শিল্পী-শুরু করো তোমার নেউরের নিকন-অপরুপ ছন্দে প্রাণ পাক সকলে।
আমরা সবাই রাজা গানের সাথে একজন নৃত্য পরিবেশন করে। রাজা, রানী ও সভাসদ আনন্দিত হয়।
রাজা : অপূর্ব-প্রাণ ভরে গেল-কি বলো রানী?
রানী : হ্যা, ভালো।
১ নং সভাসদ: অপরুপ লীলা ভরে প্রাণ নেচে ওঠেছে।
সভাসদ : ঠিক-ঠিক-ঠিক
রাজা : হে ছন্দিত শিল্পী-তোমার পদযুগনের নন্দিত তালে উচ্ছলিত গতিছন্দ ছড়িয়ে গেছে সকল দিকে। ধন্য আমি তোমার নৃত্যদর্শনে। আনন্দে ডগমগ।
শিল্পী : মহারাজের জয় হোক।
রাজা : এই নাও-আমার উপহার (রাজা গলার মালাখুলে দেয়)।
রানী : এ অনেক মূল্যবান।
রাজা : রাজার উপহার মূল্যবানই হয় রানী।
রানী : এ অনেক মূল্যবানই হয় রানী।
সভাসদ : সকলের ভালবাসার রাজার জয় হোক।
১ নং সভাসদ : শান্ত-শান্ত-শান্ত হোন সবাই।
রাজা : প্রিয় সভাসদবৃন্দ, আমি আগামী কাল প্রভাতে কর্নসুবর্ণ দেশের রাজার  আমন্ত্রণে যাব অভিষেক অনুষ্ঠানে। বন্ধু সে আমার-না গেলে মনে কষ্ট পাবে।
১ নং সভাসদ : আমাদেরও কষ্ট। আমরাও ভালবাসা হারাবো।
রাজা : না-না-এ কথা উচ্চারন করো না। তোমাদের ভালবাসায় সিক্ত আমি-এ হারাবার নয় প্রিয় বন্ধুগন। কর্নসুবর্ন দেশে যেতে আসতে লাগবে প্রায় এক পক্ষকাল। আমার এই অর্ধ মাসের অনুপস্থিতিতে দেশ চালাবে তোমাদের রানীমাতা (শোনা মাত্র সভাসদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়)
শান্ত-শান্ত-প্রিয় বন্ধুগন, আশা করি তার আর ভালবাসায় আমার প্রিয় প্রজাকুল আনন্দেই থাকবে।
সভাসদ : আপনার যা ইচ্ছে।
রাজা : বল, রানী তুমি কিছু বলো ?
রানী : নিয়মে চলবে দেশ-যা আছে তাই থাকবে।
রাজা : প্রিত হলাম-আনন্দিত হলাম। আশা করি যোগ্য উত্তরসরী হবে তুমি। বলো সবাই মহারানীর জয় হোক।
সভাসদ : জয় হোক (আস্তে)
রানী : উচ্চাস্বরে বলো।
রাজা : হা-হা-হা-মহারানীর জয় হোক।
১ নং সভাসদ : মহারাজা, প্রজাগন মেহমান খানায় অপেক্ষা করছে।
রাজা : ও হ্যা-হ্যা-চলো, আমার প্রিয় প্রজাকুলের নিকট বিদায় নেই। (কথক আসে)
কথক : তো, রাজা তো সকলের সাথে কুশল বিনিময় করে চলে গেল কর্নসুবর্ন দেশে। রানীমাতা বসলেন সিংহাসনে। আর তার পাশে জুটে গেল তোষামদকারী আর চাটুকদার।
[রানী সিংহাসনে বসে। সভাসদ ১ নং সহ দুইজন চাটুকদার।]
১ নং চাটুকদার : রানীমাতা, এ সিংহাসন যেন একটু বেশী ঝলমল ঝলমল করছে। এক উজ্জল আভা ঠিকরে বের হচ্ছে।
২ নং চাটুকদার : রানীমাতা বলে কথা-তার অঙ্গ থেকে উদ্ভাসিত হচ্ছে বর্নিল আলো।
১ নং চাটুকদার : ভালো-ভালো-লক্ষন ভালো। নারী হলো দর্শনধারী, গুনবিচারী আর সুন্দরী।
২ নং চাটুকদার : আমাদের রানীমাতা এই তিন গুনে মহিমান্বিত।
২ জন : জয় হোক রানীমাতার।
রানীমাতা: ধন্য ধন্য আমি। তোমাদের মধুর বাক্য আর ছন্দিত কথন আমাকে আরো উজ্জলিত করেছে। তোমরাই আমার উপযুক্ত সভাসদ-তাইতো আগের সভাসদের দিয়েছি ছুটি।
১ নং : বেশ-বেশ উপযুক্ত কাজ
২ নং: আহা-আহা-দুষ্ট লোকদের মাথায় বাজ (প্রহরী আসে)
প্রহরী : মহারানী, প্রজারা সব অপেক্ষা করছে
রানী : কেন, কি চায় তারা ?
১ নং : সিংহাসনে বসতে না বসতে প্রজাকুল।
২ নং : একটু যে আরাম আয়েস করবে তার জোনেই
প্রহরী : বহুদিনের নিয়ম, রাজা দরবারে প্রতিদিন প্রজার কথা শোনে।
রানী : আহা, নিয়ম
১ নং : যাও, হবে না দেখা
২ নং : বলে দাও, রানীমাতা রাজকর্মে ভীষন ব্যাস্ত।
রানী: দাঁড়াও-উপেন এসেছে-ঐ চাষা উপেন
প্রহরী : জি, এসেছে
রানীমাতা : তবে সকল প্রজারে যেতে বলো, শুধু
১ নং : উপেন রে আনো ধরে
২ নং : চাষা-নরকের হুনুমান (প্রহরী চলে যায়)
রানীমাতা : আমার আনন্দ সুখ আকাঙ্খা ধূলি তলে গুমরে মরে। বহুদিনের স্বপ্ন আমার একটা ইচ্ছা তাও হয়নি পূরণ।
১ নং : কারণ
রানীমাতা : ঐ চাষা উপেন, জমি দিল না
২ নং : আজ প্রথম কাজ হোক আপনার স্বপ্নপূরণ (প্রহরী উপেনকে নিয়ে আসে)
প্রহরী : রানীমাতা, উপনে
১ নং : দুরে-দুরে
২ নং : উহু-গন্ধ-সরে-সরে
রানীমাতা : উপেন, কেমন আছো ?
উপনে: ভগবান, আর রাজার আর্শীবাদে আছি বেচে।
১ নং : জানো তো, এখন দেশের ত্রানকর্তা এই রানীমাতা
২ নং : তিনি দন্ডমুন্ড, তিনি আমাদের মাথা।
রানী : গত শীতে আমার বাগিচা বানাতে তোমার দুই বিঘা জমি চেয়েছিলাম তা-তুমি তো দিলে না-
১ নং : ছি-ছি-উপেন
২ নং : তুমি এতো খারাপ
উপেন : ও, আমার সপ্তপরুষের ভিটে মাটি, আমার শেষ আশ্রয়-এ মাটি সোনার বাড়া
রানী : আহা- পুরানো কথা রাখো-ওটা দিতে হবে।
উপেন : রাজা তো ও জমি বাদ দিয়ে বাগিচা করেছে।
১ নং : এই বেটা-চুপ-এখোন রাজা কে ?
২ নং : এখোন ক্ষমতাধর কে ?
উপেন : দয়া করেন-দয়া করেন।
রানী : দয়া! তুমি আমার অহংকারে আঘাত করেছো। আমার দীর্ঘদিনের সুপ্ত বাসনা বিশাল এক বাগিচা-নাম তার নন্দন কানন-ফুলের সমারোহ-আমি ঘুরে বেড়াব-খেলবো- নাচবো এই দুই বিঘে পেলে সকল দিক সমান হবে তখন পাইনি কিন্তু এবার ওটা চাই।
উপেন : আপনে ত্রান কর্তা-রাজামশায়
রানী : আহা-বার বার একই বাক্য শ্রবণে ভাল লাগে না। তোমার কথনে তীব্র ক্রোধের উৎপত্তি হয় আমার।
উপেন: আমার ওপর অবিচার করবেন না রানীমাতা।
রানী : না, তা করবো না-সেদিনও বলেছিলাম আজও বলছি-জোর করে তোমার জমি নেব না
১ নং: প্রশ্নই উঠে না
২ নং : রানীমাতা সে রকম মানুষই না
রানীমাতা : ওর উপযুক্ত অর্থ দেব তোমারে
১ নং : দেখ উপেন, কি আছে তোমার-এই অর্থ দিয়ে চলে যাবে অনেকদিন
২ নং : একা মানুষ, তোমার আবার জমি কি হাটে, মাঠে, ঘাটে যেখানে রাত সেখানে কাত
উপেন : রানীমাতা ভূ-স্বামী আপনার জমির অন্ত নাই শুধু আমার মরবার মত এ ছোট্ট জায়গা আপনি নেবেন না-ভগবান আপনার ভালো করবে।
রানী : আহা-দাউ দাউ বহ্নিমান পরান পিয়াস। কৃষ্ণকান্তি কষ্ট পুষ্প অন্তরে ফুটে আছে বহুদিন। বুকে ক্ষত হয়ে আছে আমার আকাঙ্খা-শুধু অপেক্ষা করছি। কামনা করেছি- উপযুক্ত সয়ম এলে নিবো, গত হয়েছে এক বর্ষ-এবার সময় পেয়েছি- সবকিছু আমার হাতে-
উপেন : ঠিক আছে রানীমাতা রাজা ঠাকুর ফিরে আসা পর্যন্ত সময় দেন আমাকে।
রানী : প্রহরী-(প্রহরী আসে) নিয়ে যাও একে। (প্রহরী নিয়ে যায়)
উপেন : দয়া করেন রানীমাতা-আমার বাপ দাদার এ মাটি কেড়ে নিবেন না-রাজামশায় এ কাজ করেন নি-আপনিও
রানী : আহা-নিয়ে যাও (প্রহরী নিয়ে যাও)
রানী : আহা-নীতি কথা শুনাবে না আমায়। দাউ দাউ বহ্নিমান আমার পরান পিয়াস। কৃষ্ণকান্তি কষ্ট পুষ্প অন্তেরে ফুটে আছে দীর্ঘদিন-ক্ষত হয়েছে আমার আকাঙ্খা-শুধু অপেক্ষা, অপেক্ষা করেছি উপযুক্ত সময়ের।
১ম জন : সেই তো জ্ঞানীজন যে জন সময়কে বাঁধে নিজ প্রয়োজনে
২য় জন : সময় পেল হরিনীর মত দ্রæত বেগে যায়
উভয়: অতএব
রানী : এবার পূরণ হবে কাঙ্খীত বাসনা আমার
১ নং : সাহস কত-রানীমাতা বলেছে, তবুও
২ নং : কিছু মনে করবেন না রানীমাতার-রাজা মশায় এর জন্য দায়ী। এ সব চাষা ভূষদের মাথায় তুলে রেখেছে।
রানীমাতা : এ আমার অসম্মান-সকলের কাছে লজ্জা-সামান্য এক চাষা-তার এতো অহংকার
১ নং : আপনি কোন চিন্তা করবেন না রানীমাতা
২ নং : আঙ্গুল একটু বাঁকা করতে হবে। সাপও মরবে-লাঠিও ভাঙ্গবে না।
রানী : পথ বের করো। আগামী দুইদিনে আমার হুকুম তামিল হওয়া চাই।
১ নং : বুদ্ধি এসেছে ঘটে
২ নং : বটে-বটে
১ নং : কোন জলুম না, কোন উচ্ছেদ না নিয়মে-আইনে নেব এই দুই বিঘা জমি-রাজাও অভিযুক্ত করতে পারবে না।
রানী : শ্রীঘ্রই প্রকাশ করো।
১ নং : চাষা উপেন, ঋন নিয়েছে রাজ কোষাগার থেকে-শোধ করতে পারে নি। মামলা ঠুকে দেব-তারপর হবে ডিগ্রি-সবই বিক্রী
রানী : কিন্তু সময় নেওয়া যাবে না-যা করবে তা ১৫ দিনের আগেই করতে হবে।
১ নং : সাত দিনেই শেষ হবে শেষ। বিচারক আপনার পাইক। যা বলবেন সেই মতে হবে কাজ।
২ নং : যদি বিচারক রাজী না হয়-তবে দেবেন ছুটি-সেখানে নিজের লোক বসে
১ নং : হু-বিচারক বিভাগের স্বাধীনতা রাজার চিন্তা ভাবনা-কত অসুবিধা হয় রাজকার্যে
রানী : প্রয়োজন নেই অতি কথনের। শুরু করো কাজ
উভয় : আজ্ঞা রানীমাতা। (সবাই চলে যায়। কথক আসে)
কথক : দেখলেন তো, তোষামদকারী আর চাটুকদারীর কি বাহারি কথা। রানীমাতা তো অহংকারে আকাশ ফুড়ে উঠতে চায়। মাত্র কয়েকদিনের ক্ষমতায় বসে এতো দিনের সকল নিয়ম আইন কানুন সব লন্ডভন্ড করে দিল। রানী যা মনে করে তাই করে, প্রজারা রানীর এই স্বেচ্ছাচারিতা আচরনে দিশেহারা। অপেক্ষা, কখন আসবে তাদের দয়াময় রাজা। হ্যাঁ উপেনের কথা বলি।
তো গরীব চাষা উপেন যে জমি মাটি কামড়ে থাকতে চেয়েছিল, তার সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না। মিথ্যা দেনায় ডিগ্রি করে বিক্রি হলো দুইবিঘা জমি-বাগিচা হলো। রানীর নন্দন কাননমনের দুঃখে উপেন ভিটে মাটি ছেড়ে দেশান্তরি হলো চোখের জল ফেললো তার বক্ষের ভিটেতে।
কিন্তু তারপর
যাই, রানীমাতা আসছেন
(কথক চলে যায়। রানীমাতা দুইজন চাটুকদার সহ আসে)
রানীমাতা : না-না-সারাদিন রাজকার্য্য-প্রাসাদের অভ্যন্তরে ঘোরা ফেরা-ভাল লাগছে না আর। মন মাঝে মাঝে বিষাদে ছেয়ে যায়, রাতে ঘুম আসে না-একটা উপায় বের করুন।
১ নং : উপায়
২ নং : হায়-হায়
ঠাকুর: উপায়-আছে-আছে-শিব ঠাকুরের যজ্ঞপূজা, তবে অন্তরে পাবেন প্রশান্তি। পূণ্যবর্তী নদীতে ¯œান শেষে যজ্ঞের আয়োজন করলেই মন নদীর মত সলিল হবে-¯্রােতের মতো হবে গতিছন্দ, ঢেউয়ের মত উচ্ছল।
রানীমাতা : ঠিক কথা-বহুদিন কোন ধর্ম পালন করা হয়নি। ঠাকুর, আয়োজন করুন।
ঠাকুর : এ জন্যে যেতে হবে পূণ্যবর্তী নদীর তীরে-প্রভাতে ¯œান করে নদীর পারে করতে হবে যজ্ঞপূজা।
১ নং : হবে হবে সব হবে
২ নং : যজ্ঞ-ভজ্ঞ-হবে সব আয়োজন।
১ নং : ধর্ম, খুব বড় আবরন রানীমাতা। প্রকাশ্য প্রজা দেখবে রানীমাতার পূজা করছে, তাতে যত অন্যায়, যত জুলুম সব দর্ম দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়। এও এক মস্ত অস্ত্র।
রানীমাতা : তবে আগামীকাল প্রভাতে করো যজ্ঞের আয়োজন। পূর্ণবর্তী নদীর বিষ্ণু ঘাটে হবে ¯œান।
ঠাকুর : যে মতে কমর্, সে মতে হবে মহারানী, ও সব্বমঙ্গল মঙ্গলাং বরেন্যাং বরদং শুভম নারায়নং নমস্কৃত্য।
(কথক আসে)
কথক : তো যেই কথা, সেই কাজ।
রানীর ইচ্ছা যেন মেঘের বাজ
হৈ হৈ পরে গেল সারা রাজ্যে-অনেকে অবাক হলো-অনেকে খুশী হলো-যাক রানীমাতার ধর্মে তবে মন বসলো-এবার যদি ভাল কিছু হয়। বিষ্ণু ঘাটে ফুল, বেল পাতা, ঘট, পুরুত ঠাকুর সে এক লষ্কাকান্ড। ঘাট ঘষা মাজা করে তাক তাক-নদীর পানি পরিষ্কার করার বৃথা চেষ্ঠা-রানীমাতার যজ্ঞপূজা বলে কথা।
পরদিন প্রভাতে রানীমাতা সাখীদের নিয়ে যজ্ঞপূজার ¯œান শুরু করলো।
ঘোষনা মতে গ্রামের সকল মানুষ গড় হয়ে প্রনাম করলো রানীমাতাকে-ঢোল, কাসা বেজে ওঠলো তাক দুমা দুম তাক, পুরুত ঠাকুর মন্ত্র পরে, আর ওলুঠধ্বনি দিয়ে ¯œান করলো সলিল পূণ্য নদীতে মহীয়সী রানী। তারপর বসন বদলে যজ্ঞ পূজা (রানী বসে উচুঁ স্থানে) পাশে পুরুত ঠাকুর। পুরুত মন্ত্র পড়ে-হঠাৎ কিছু শব্দ, দেখা যায় রানী কাঁপছে শীতের হাওয়ায়।
ঠাকুর : ও মাত: শৈলসুতা সপতিন বসুধা শৃঙ্গারহারাবলি স্বগাহোরণ বৈজন্তি ভবতীয়ং ভাগীরথী প্রার্থয়ে (রানীমাতা কাঁপতে কাঁপতে ওঠে দাঁড়ায়)
রানী : আরে রাখো তোমার ভাগীরথী-আগে শীত থেকে বাঁচাও আমাকে। সারা শরীরে কাঁপন ধরেছে-উহু-উহু-ঠোট কাঁপছে-গা কাঁপছে-হাত কাঁপছে, বাঁচাও-শীতের হাত থেকে বাঁচাও।
১ম : শীত-অসুখ, কুৎসিত, নরকের কীট
২য় : ক সাহস, রানীমাতার শরীরে আঘাত
১ম : সাবধান-সাবধান-পাইক পেয়াদা সৈন্যগন সাবধান-শীত যেন কিছুতেই আসতে না পারে রানীমাতার কাছে-
২য়: বন্ধ করে দাও বাতাস
১ম : ঢেকে দাও আকাশ
উভয় : শীত-শীত-নরকের কীট
(সকলে মিলে খুজতে শুরু করে শীতকে। রানীকে ঘিরে ধরে)
১ম : ধরো টুটি চেপে ধরো শীতের
২য় : খুচে খুচে মারো শীতকে
রানী : উহু-উহু-
১ম : ঠাকুর মশায় দেখি আপনার বাহাদুরী, বন্ধ করে দিন শীতের বাতাস
ঠাকুর : ওঁ নমো নমো শীত, চলে যাও দ্রæত, রানীমাতাং মোদের সম্মান করো, নমো-নমো
রানীমাতা : উহু-উহু-নমো-নমো
ঠাকুর : প্রভাতের দিনমনি লুকায়ে ঘন মেঘের আড়ালে তপ্ত হয়নি তাই মাটি ধূলিকণা, হয়নি আকাশ বাতাস, আর তাই হু-হু শীত আসতে রেয়ে।
১ম : এসেছে ঘটে-আগুন-আগুন
২য় : সে কি কোথায় ?
১ম : আরে চুপ-এখন প্রয়োজন আগুন, একমাত্র আগুনের তাপে দূর হবে শীতের বাতাস
২য় : ঠিক ঠিক-প্রয়োজন আগুন
রানী : তবে আর দেরী কেন-লাগাও আগুন-দূর করো নরকের শীতকে।
১ম : কিন্তু শুকনো খড়ি-কাঠ
২য় : আগুন লাগবে কিসে
রানী : কেন-ঐ যে কুড়েঘর-ওই ঘরগুলিতে লাগাও আগুন
জনৈক: রানী মা-ক্ষমা করবেন ঐ কুড়েঘর হয়তো কোন সাধুু সন্যাসীর, নয়তো কোন দীনজনের।
রানী : এই দুর করে দে এর-দয়ীময়ী-উহু-শীতে মরে গেলাম
কথক : শুরু হয়ে গেল নিষ্ঠুর, হিং¯্র যজ্ঞ। আগুন লাগালো সকল কুড়ে ঘরে।
ঘন ঘোর ধুম ঘুরিয়া ঘুরিয়া
ফুলিয়া ফুলিয়া উড়ির।
দেখিতে দেখিতে হু হু হংকারি
শত শত লোল জিহব্বা প্রসারি
বহ্নি আকাশ জুড়িল
পাতাল ফুড়িয়া উঠিল যে রে
জ্বালাময়ী যত নাগিনী।
প্রভাতে পাখির আনন্দ গান
ভয়ের বিলাপে টুটিল
কুটির হইতে কুটিরে অনল
উড়িয়া উড়িয়া ছুটিল,
ছোটো গ্রামখানি লেহিয়া লইল
আগুনের তপ্ত শিখায়
আর এ দিকে প্রমোদ ক্লান্ত সখীদের নিয়ে রানী তপ্ত হয়ে ধীর পায়ে চলে প্রাসাদে।
গৃহহারা হয়ে দীন হীন মানুষেরা কেউ চলে গেল পাশের গ্রামে, কেউ আশ্রয় নিলো গাছের তলে। কেউ অপেক্ষা করতে লাগলো রাজার আগমনের। ঠিক এক পক্ষ কাল পর এলো রাজা। তার প্রিয় রাজা এসে শুনে সব করুন কাহিনী। রাজার হৃদয়ে কাপন লাগে-কষ্টে ক্ষত হয় প্রানে-চোখ ভিজে আসে পানিতে।
রাজা : কি বলছো তোমরা-আমার প্রিয় প্রজাদের এ অবস্থা।
১ম সভাসদ : আজ্ঞে মহারাজ কেউ গাছের তলায়, কেউ খোলা মাঠে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ চলে গেছে পাশের গাঁয়ে।
২য় : এ দু:সময় আমাদের রাজ্যে আর কোনদিন আসেনি। বাতাসে গৃহ হারা, সর্ব্বহারা মানুষেদের বিলপিয়া গীত।
১ম : আহাজারিতে ভারী হয়ে গেছে বাতাস। শুধু কি এই-আপনার হুকুম অমান্য করে রাজ বাগিচা নতুন করে বানানোর জন্য উপেন কে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
২য় : দিশেহারা উপেন ভিটেমাটি ছেড়ে এখন দেশান্তরী।
রাজা : চুপ করো চুপ করো-শুনতে চাইনা আর এ ধ্বংস যজ্ঞের বিবরণ।
২য় : প্রজারা সব আপনার অপেক্ষায়-কি হবে এখন?
রাজা : সর্ব্বাগ্রে হবে রানির বিচার-এ পাপ কর্মের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শাস্তি।
উভয় : রাজা !
রাজা : এক্ষুনি ডাকো রানিকে (একজন প্রহরী চলে যায়) হায় ঈশ্বর, এ কোন পাপ কুন্ডে নিক্ষেপ করলে আমাকে-আকাশ-বাতাস বির্দন করে ভেসে আসে শোকাহত প্রজাদের আর্তনাদ (রানী আসে)
রানী : এসেই রাজদরবার-দীর্ঘ ভ্রমনে ক্লান্তি চোখে মুখে-বিশ্রাম প্রয়োজন।
রাজা : মহিষী এ কি ব্যবহার, এ কি ধ্বংস যজ্ঞের খেলা বলো রানী বলো, কোন কারনে প্রিয় প্রজাদের গৃহ আগুনে ভস্মিভুত করলে বলো উত্তর দাও
রানী : গৃহ বলো কি করে ? আর গেছে গুটি কত জীর্ন কুটির, কতটুকু ক্ষতি হয়েছে প্রাণীর ? কত ধন যায় রাজমহিষীর একদিনের প্রমোদের জন্য।
রাজা : তুমি নিজ হাতে যে হিং¯্র নিষ্ঠুরতা করেছো তার ভয়ালে, কৃষ্ণ যবনিকা নেমে এসেছে আমার প্রিয় রাজ্যে
শোকে চাঁদ ওঠে না আকাশে
পোড়া মাটির গন্ধ বাতাসে
অসহায় প্রজাদের বিলপিয়া ধ্বনি
গাভীর দুঃখ জর্জরে ভরা এমন রাজ্যতো তুলে দেয়নি তোমার হাতে।
রানী : যদি হয়েই থাকে কিছু, রাজ দরবার থেকে অর্থ দিয়ে পুনরায় বানানো যাবে কুটির, এতে উতালা কেন রাজা ?
রাজা : হায় মহিষী-বোঝাবো কি করে তোমাকে ? কি করে জানবে কতো বড় অন্যায়, কত বড় পাপ কায্য করেছো তুমি ? প্রজাদের দুঃখে বুক আমার ফেটে যাচ্ছে-লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসছে।
রানী : এ সব বিষয়ে পরে আলাপ হবে-প্রসাদে চলুন।
রাজা : না রানী, সর্ব্বগ্রে হবে এ নিষ্ঠুরহীন কার্যের বিচার।
রানী : বিচার?
রাজা : হ্যাঁ-যতদিন তুমি আছ রাজরানী-দীনের কুটিরে আগুনে যে ক্ষতি হয়েছে তা বুঝবে না তুমি/আর তাই রাজরানী থেকে তোমাকে ভিখারী হয়ে বোঝাবো আমি। বেঁচে থাকা কাকে বলে ? আনন্দ কি, সুখ কি, আপন অন্তর তলে শেনিতে শিহরি শিহরি করবে তুমি অনুভব।
রানী : কি উচ্চারণ করছেন রাজা।
রাজা : আমার বিচারে এই তোমার শাস্তি। যাও এই মূহুর্তে তুমি নহ রাজরানী, নহ রাজমাতা-তুমি সামান্য ভিখারী রমনী, পথে পথে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করে দিন কাটাবে। অর্থ যোগাবে-তোমার খুশী মেটাতে যে কটি কুটির হয়েছে ছাড়খার সে কটি আবার গড়ে দিতে হবে তোমার। যে বাগিচার জন্য আমার নির্দেশ না মেনে উপেন কে করেছো দেশান্তরী, তাকে খুজে আবার ফিরে দিতে হবে তার দুই বিঘা জমি। বৎসর কাল দিলাম সময়। স্থান থেকে স্থান্তর করবে তার সন্ধান। তারপর ফিরে এসে সভায় দাঁড়ায়ে জানাবে কত ক্ষতি করেছো প্রজাদের, কি অন্যায় করেছো উপেনের উপর।
এই কে আছিস-নিয়ে যা রানীকে-পড়িয়ে দাও ভিখারী পোষাক-বেরিয়ে পরুক পথে পথে- (প্রহরী নিয়ে যায়)
সভাসদ : দয়াময়ী রাজার-জয় হোক
প্রজা হিতৌষী রাজার-কল্যাণ হোক
কথক : না-নাটকের শুরুতে যতটা ভীত হয়েছিলাম, এখন খুব স্বস্তি পাচ্ছি। এমন প্রজাদরদী রাজা যে রাজ্যে আছে সেখানে কোন অঘটন ঘটতে পারে না-
রবীন্দ্রনাথ তার সকল গল্পে রাজাকে এমনি ভাবে মানুষের হৃদয়ের সাথে ভালোবাসার সুতায় গেঁথেছেন।
তাই এই নাটক দর্শনে কামনা করি
মানিবক সুখ দুঃখ জাগুক হৃদয়ে
যেন মনুষ্য আলোয়
কাঞ্চনের আভা মেখে করুক ঝিলিমিলি
অগ্নিময় রথে তরঙ্গসম সুতীব্র গতিতে
ছুটে আসুক ভালোবাসা
মাথার ওপর বর্ষিত হোক
ঈশ্বরের আর্শীবাদ
রাজা প্রজার মধুর মিলনে
সকল আন্তা নতুন রঙে রাঙিয়ে ওঠুক
জাগ্রত হোক মানবতা
আমরা চলব আপন মতে, শেষে মিলয় ভারি পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button