গল্প
Trending

একটি কাঠপেনসিল

বজলুল করিম বাহার

ছেলেটি দাদিআম্মার ঘরে ঢুকে তাকে দেখলো পড়ার টেবিলে। কী যেন লিখছেন তিনি। নাতি জিগ্যেস করে, ‘কী লিখছো তুমি ? চিঠি ? কাকে ?’
লেখা বন্ধ করে তাকালেন তিনি। বললেন, ‘গল্প লিখছি। তোমাকে নিয়ে না হলেও, তোমার জন্য।’
‘আমাকে নিয়ে, সত্যি ?’ নাতি অবাক হয় ।
‘হ্যা, তাই—ই। লিখছি আমার এই কাঠ পেনসিলটি নিয়ে। যেটি দিয়ে আমি লিখতে পছন্দ করি।’
‘দাদিআম্মা, এই পেনসিলটির সাথে আমার কী সম্পর্ক ?’
‘আছে। সম্পর্ক আছে। যেটা তুমি বড় হলে বুঝতে পারবে। এই তুমি বড় হলে বুঝতে পারবে। এই পেনসিলটি তখন তোমার ভাল্লাগবে।’
কৌতূহলী হয়ে নাতিটি তখন মনোযোগ দিয়ে পেনসিলটি লক্ষ্য করে। পেনসিলটি মোটেও অবাক করার মতো কিছু বলে মনে হলো না তার । অন্যান্য পেনসিলের মতোই মনে হলো।ঃ
নাতি বললো, ‘এতে কী এমন রয়েছে বলতো ? আমার কাছে এটি তেমন কোন কিছু ভাবাচ্ছে না।’
‘সেটি নির্ভর করে, কীভাবে দেখছো তুমি পেনসিলটিকে, তার উপর।’
‘তার মানে ?’ নাতি কৌতূহলী হয়ে তাকায়।
‘এর সাথে পাঁচ পাঁচটি গুনাবলী জড়িয়ে আছে। ঠিক তোমার মাঝেও আছে সেই গুনগুলো। সেই গুনগুলো যদি ঠিকঠিক কাজে লাগাতে পারো, তাহলে জগৎজুড়ে তা হবে অনেক উপকার ও কল্যাণের কাজ। শান্তি কল্যাণ হয়ে দেখা দেবে। তুমিও এতে সুখী হবে। যা বলে শেষ করা যাবে না।
‘তাই বুঝি ?’ নাতিটি বলে ওঠে।
‘প্রথমটির কথাই বলি। তোমার মাঝে অসাধারণ কোন কিছু করার সামর্থ্য রয়েছে। যা তুমি নিজেও জানোনা। আর একটা গোপন হাত সব কাজ করার জন্য তোমাকে গাইড করতে চাইছে। তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ কী হবে, কী ভাবে চলতে হবে, বলতে হবে, শিখতে হবে ইত্যাদি নিয়ে চুপি চুপি পরামর্শ দিয়ে চলেছে। তুমি তার কিছু অনুসরণ করছো, আর গুলো বাদ দিয়ে যাচ্ছো। যাকে আমরা বলি ঈশ্বরের হাত। তিনি গোপনে তোমাকে, আমাকে সবাইকে চালনা করার জন্য সাহায্য করতে চাইছেন। এতে সাড়া দেওয়ার উপর নির্ভর করছে, তুমি কতটুকু কাজ সারাজীবনে সম্পন্ন করতে পারবে।’
নাতিটি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো দাদিআম্মার কথা।
‘এবার তোমাকে বলছি দ্বিতীয় আরেকটি গুনের কথা। এই যে পেনসিলটি দিয়ে আমি লিখছি, তা মাঝে মাঝেই ভোতা হয়ে লেখার অযোগ্য হয়ে পড়ছে। তখন আমাকে শার্পেনার দিয়ে এটিকে ছেঁটে ভেতরের শীষটিকে লেখার উপযোগী করে তুলতে হচ্ছে। এই কাজটি পেনসিলের জন্য বেদনাদায়ক। কেননা তার চামড়া, রক্ত মাংস এতে আহত হয়ে কষ্টকর যাতনা সহ্য করতে হচ্ছে। এর দ্বারা কী শিখলে তুমি ? তোমার মাঝেও কর্মশক্তি নানাভাবে ভোতা হয়ে তুমি অকর্ম হয়ে পড়তে পারো, তখন নানা ধরনের নিবর্তনমূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে তোমাকে পথে আনতে হয়। শার্পেনারের মতো তোমার বাজে অভ্যাসগুলো ছেঁটে ফেলতে হয়। যাতে তুমি তোমার যোগ্যতা ফিরে পাও। এতে তোমার কাজের যোগ্যতা বাড়ে। কী বলো ?’
‘তা ঠিক। আমার কিছু কিছু বাজে অভ্যাস ও আচরণ তোমার বকুনিতে ঠিক হয়েছিল, এখন বুঝতে পারছি।’
‘হ্যা, ঠিক তাই—ই দাদু। এখন বুঝতে পেরেছো তো ?’
‘তৃতীয় আরেকটি গুন হচ্ছে, পেনসিল দিয়ে লিখতে বা আঁক কষতে ভুল করলে, ভুল দাগ পড়লে, আমরা ইরেজার দিয়ে সেই দাগ মুছে ফেলে সংশোধন করে নেই।’
‘আমাদের মধ্যেও এমনি অসংখ্য ভুল, ত্রুটি, আমাদের কাজকে মলিন করে দেয়, দিতে পারে। তখন সেটি শুধরে নিতে হয়। ইরেজারের মতো শৃংখলামূলক কাজের মাধ্যমে আমরা তা সংশোধন করি। সঠিক কাজটি সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হয়। কাজের বেলায় এই সুবিচার করাটাই হলো ইরেজারের মতো ভুল মুছে ফেলার কাজ।’
‘ঠিক বলেছো, দাদু। আমার ভুলগুলো তুমি আম্মা ও আব্বা এভাবেই ইরেজ করে দাও। তাইনা ?’ নাতি কথার সুর ধরে বলে।
‘এবার বলছি আরেকটি বিশিষ্টতার কথা দাদু। যেমন ধরো পেনসিলের দৈহিক একটি শক্ত কাঠোমো থাকে। একটি বাইরের আবরণ, আরেকটি হলো ভেতরকার লেখার জন্য ব্যবহৃত লিড বা শীষ। পেনসিলের আচড় ভালো হবে না খারাপ হবে তা নির্ভর করে ঐ কালো লিডটির উপর, যা দিয়ে লিখতে হয়। ভালো দাগের জন্য ঐ শীষটির উজ্জল ভূমিকা থাকে। মানুষের বেলায়ও তাই। তোমার দেহের বাইরের চাকচিক্যই সবটুকু নয়। তোমার অন্তরের চেতনার মূল্যও কম নয়। অন্তরের চেতনা যত বিকশিত হবে, তত মানুষ আলোকিত হবে। কাজেই অন্তরের চেতনাকে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। ঐ জন্যই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন। অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে।’
নাতিটিকে হাই তুলতে দেখে দাদিআম্মা বললেন, ‘তোমার ক্লান্তি লেগেছে। আর বেশি নয়। এবার শেষ গুনটির কথা বলবো।’
নাতি জবাবে বলে, ঠিকতা নয় দাদিআম্মা। একসাথে এতগুলো ভালো কথা কী করে মনে রাখবো, যে কথাই ভাবতে গিয়ে হাই উঠেছে।’
‘এবার যে শেষ গুনটির কথা বলবো, তা হচ্ছে পেনসিলের মাধ্যমে কোন লেখাটা কাগজে অঙ্কিত হয়েছে। কী ধরনের দাগ পড়েছে সাদা পৃষ্ঠাগুলোতে। যথার্থ না অর্থহীন ? দরকারী না ফালতু ? শুধুই কী দাগ ? ময়লা কালো আবরণ, না কী সুন্দর মর্মার্থ বিশিষ্ট ? উপকারী, না কী অপকারী ? এটি বিবেচনার প্রয়োজন হয়।
তেমনি আমরা যাপিত জীবনে এভাবেই এক কর্মরেখার দাগ টেনে আসি। সেই দাগটি উপকারী, কল্যাণকর হবে নাকি তা হবে ক্ষতিকর, বিনষ্টির কারণ, সে বিষয়টি ভাবনায় রেখে কাজ করার অবকাশ রাখা চাই। আমাদের জীবনে ভালো একটি কাঠ পেনসিল ব্যবহার করতে পারার মতো এই কাজের মহিমাটুকুই বড় এক প্রাপ্তি।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button