ভ্রমণ
Trending

চাঁদনী রাতে গোলপাতার বনে

মারুফা আক্তার

ভ্রমণ আমাদেরকে হাজারো অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর জানা-অজানার কাছাকাছি নিয়ে যায়। সেই সূত্র ধরেই দেখে এলাম বাংলাদেশের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন। যা সমুদ্রের জোয়ারের নোনা পানিতে সাময়িক নিমজ্জিত থাকে। যেখানে জোয়ারের সময় পানি উঠে এবং ভাটার সময় পানি নেমে যায়। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবনটি ভ্রমণ পিপাসুদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে রাখে।
খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলার অংশ নিয়েই বাংলাদেশের সুন্দরবন। ভারতের সুন্দরবন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা ও উত্তর ২৪ পরগণা জেলা নিয়ে গঠিত। আমরা আনুমানিক বিশ জনের মতো একটা দলে আবদ্ধ হয়ে সুন্দরবনের উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছিলাম। সবার চোখেই ছিল উচ্ছ্বাস। বুঝতে পারছিলাম প্রকৃতি আর মানুষ একে অপরের পরিপূরক। এ জন্যই গৃহবাসী মানুষ বার বার প্রকৃতির কাছাকাছি ফেরে।
যাত্রাপথে রাস্তার দুপাশের সবুজ আর আমাদের পূর্বের ভ্রমণের গল্পে সবাই ব্যস্ত থাকি। গল্পে-গল্পে অপরিচিত ভ্রমণসঙ্গীরা আরও বেশি পরিচিত হয়ে উঠে। বাড়ে বন্ধুত্ব। তাহলে বলা যায় ভ্রমণ বন্ধুত্বের দ্বার খুলে দেয়। ঢাকা থেকে মোংলা বন্দরের যাত্রাপথ কম ছিল না। তবে ঐ যে ভ্রমণের উচ্ছ্বাস, পথের ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দেয়। ভ্রমণ মানুষকে সহনশীল করে তোলে। বিভিন্ন সমস্যায় কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হয়, সে আত্মবিশ্বাসটুকুও শিখিয়ে তোলে। প্রায় দুপুর নাগাদ আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম মোংলা বন্দরে। মোংলা বন্দর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খুলনা বিভাগে অবস্থিত একটি সমুদ্র বন্দর। আবার বলা যায় দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যস্ততম বন্দর। খুলনা মহানগরীর দক্ষিণ-পূর্বে পশুর নদীকে ঘিরে এ বন্দরটির গড়ে ওঠা। এই বন্দরের আদি নাম চালনা বন্দর। মোংলা থেকে সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে নৌকা ভ্রমণ। পাড়ি দিতে হয় পশুর নদী। বাংলাদেশের গভীরতম নদীর মধ্যে অন্যতম এটি। নদীটি সর্পিলাকার। বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় জোয়ার ভাটার পানি বহন করে। সুন্দরবন-এর কাছে গিয়ে শিবসা নদীর সাথে মিলিত হয়। এ নদী কুঙ্গা নদী নামেও পরিচিত। জোয়ারের ধাক্কায় নৌকায় কিছুটা ভয় পেলেও প্রকৃতিরূপ সব কিছুকে ছাপিয়ে দিচ্ছিল। নদীর পাড়গুলোতে সুন্দরবনের গোলপাতা গাছ জন্মে। যতটা সুন্দরবন কাছাকাছি হয় আরও বেশি ঘন গাছপালা, চোখ জুড়ানো প্রকৃতির কারুকাজ। চিত্রা হরিণ, বানর, কুমিরসহ বন্য প্রজাতির পশুপাখির অহরহ নির্ভয় আনাগোনা টের পেলাম। কৌতূহল বশত গোলপাতার পাতা নিয়েও কিছুটা গল্প চলেছিল। গোলপাতা বলা হলেও গোলপাতার গাছ কিন্তু মোটেও গোল নয় বরং নারিকেল বা খেজুর গাছের মতো লম্বা। এর ভেতর থেকে মোচাকৃতি ফুল বের হয়। ফুল থেকে দৃষ্টিনন্দন ফল ধরে। ধীরে ধীরে তালের কাঁদির মতো বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলটি পরিপক্ব হলে এর ভেতরের অংশের স্বাদ অনেকটাই কাঠ বাদামের মতো হয়। এই গোলপাতা দিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন ঘরের ছাউনি দিয়ে থাকে। এ পাতার ছাউনি নির্মিত ঘরে গরমের সময় ঠান্ডা আর শীতের সময় গরম ভাব অনুভূত হয়। পশুর নদীর পশ্চিম ঢাংমারীতে গোলপাতা ঘেরা জায়গায় গড়ে ওঠা ইরাবতী ইকো রিসোর্ট ও রিসার্চ সেন্টার ছিল আমাদের গন্তব্য। সেখানে রাত্রি যাপনের মধ্যে দিয়ে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগে নতুন মাত্রা যোগ করে। পশ্চিম ঢাংমারী খালটি ডলফিনের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। খালের পারে বসে হর-হামেশাই দেখা মিলবে লবণ পানি সহ্য করার ক্ষমতা সম্পন্ন ডলফিনের জলকেলি। রিসোর্টে প্রতিটি ঘর গোলপাতা দিয়ে তৈরি। পরিবেশ বান্ধব রিসোর্টটি প্রকৃতির সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। দুপুর নাগাদ পৌঁছে আমরা দুপুরে খাবার শেষে যে যার মতো করে রিসোর্টের চারপাশে ঘোরাঘুরি করি। ঢাংমারী খাল ঘেঁষে গড়ে ওঠা গ্রামটি ঘুরে দেখি। লবণাক্ত জলে তাদের জীবনযাত্রা, সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে জানতে পারি। কীভাবে নাগরিক জীবনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা যুগের পর যুগ টিকে থাকে। এ যেন প্রকৃতির সাথে সমতা। বেলা গড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে পেলাম। সূর্যাস্ত লাল আভায় ফুটে ওঠে এক অন্যরকম ভালো লাগা। পরম প্রশান্তি দেয় শান্ত প্রকৃতি। নিজেকে বারংবার হারিয়ে ফেলছিলাম। সুখ বোধে অনু মনে হচ্ছিল সমস্ত না পাওয়াকে।
রাত বাড়ে। পশুপাখির আওয়াজ চারপাশের শান্ত পরিবেশে স্পষ্ট কানে বাজে। ওহ বলা হয়নি, আমরা যেদিন সুন্দরবনে ছিলাম সেই রাতটি ছিল পূর্ণিমা। পূর্ণিমার চাঁদনী রাত। গোলপাতায় ঘেরা চারপাশ। সারারাত আমাদেরকে নেশার মতো ডুবিয়ে রেখেছিল। ছবি তোলার চেষ্টা করছিলাম। ফ্রেমবন্দীর বৃথা চেষ্টা। তখন বুঝতে পারছিলাম সবকিছুকে ফ্রেমবন্দী করা যায় না। পৃথিবীর সব রহস্য আবিস্কার করা যায় না। হয়তো যাবেও না। এখানেই বোধহয় মানুষ অসহায়। বনদেবী ঠিক রক্ষা করে যায় তার বনের সৌন্দর্যকে। পূর্ণিমার ভরা চাঁদ ছোট হতে হতে সূর্যাস্তের কাছে হারিয়ে যায়। নতুন সূর্য ওঠে। আবারও বেলা বাড়ে। ফেরার পথে করমজল দেখে ছিলাম। সুন্দরবন থেকে ফেরার পথে বার বার কে যেন মনের মধ্যে বলে উঠেছিল, আরেকটু সময় দিও জীবন! তোমার কাছে আবারও অর্ঘ্য দেবো বনদেবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button