
আমি তাহমিদ। আমার বয়স ১০ বছর। আমি বগুড়া জিলা স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির একজন ছাত্র। আমার ধারনা আমি নিজে একজন অন্য রকমের ছেলে। আসলেই তাই। আমি কেমন যেন অন্য রকম। আমাকে কেউ পছন্দ করে না। আমার যেগুলো বন্ধু ছিল তারাও আমার থেকে দূরে যেতে থাকে।
ক্লাসে আমার পাশে কেউ বসে না। টিফিনে কেউ আমার সাথে খেলে না। আমার পুরোনো বন্ধু কিন্তু এখন নয় সেরকম কয়েকজন গল্প করছে। আমি যদি তাদের কাছে বসি তারা ওখান থেকে চলে যায়। কেউ হয়তো এক বেঞ্চে বসে আছে। আমি সেই বেঞ্চে
বসার সাথে সাথে সবাই উঠে যায়। এখন আমার একটা নির্দিষ্ট সিট হয়ে গেছে। সেখানে কেউ বসে না। আমি টিফিনে আমাদের স্কুলের বাউন্ডারির ওপরে বসে খেলা দেখি। আগে এখানে অনেকেই গল্প করত, নাস্তা খেতো কিন্তু আমাকে দেখলে উঠে যেত। তাই বাউন্ডারিতেও আমার একটা জায়গা হয়ে গেছে। ওখানে আমি ছাড়া কেউ বসে না। এখানে কেউ এলেই এমন করে যেন ভূতের বাড়িতে এসে ভূত দেখেছে। বাসাতেও আমার একই অবস্থা। কেউ আমার কাছে আসে না। আমার সাথে কথা বলে না, আমি কাছে গেলে সরে যায়, আমার ঘরে গেলে তারাও এমন করে যেন ভূতের বাড়িতে গিয়ে ভূত দেখেছে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা যে স্যার—ম্যাডামরাও আমার সাখে এরকম করে। আমি ক্লাসে কথা বললে অথবা ক্লাসে বা পরীক্ষায় খাতা দেখলে সেটা স্যার—ম্যাডামের চোখে পড়লেও না দেখার ভান করে।
তারপর হঠাৎ একদিন দেখি— দুই বন্ধু কথা বলছে এবং আমি এই কথায় এই বুঝতে পারি যে, আমি একটা পাগল। আমার মাথায় অনেক বড় এক সমস্যা। আমি শুনে পুরোপুরি ভেঙে পড়লাম। আমি কি তাহলে পাগল? আমি কি সত্যিই পাগল? আমি কি তাহলে যাবো পাগলা গারদে? একেবারেএকা!
আমি একথা শুনে কাল স্কুলে যেতে পারলাম না। বাসায় আমি ঘর থেকে বের হলেই সবাই এমন ভয় পায় কাজেই আমি ঘরের বাইরে যাই না। পরের দিন টিফিন শেষে দেখলাম আমার নামে দলিল করা সেই বেঞ্চে হুইল চেয়ার পাশে রেখে একজন বসে আছে। আমি তাকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কেউ যে আমার পাশে বসবে এটা আমার চিন্তারও বাইরে ছিল। তারপর আমি খেয়াল করে দেখলাম ছেলেটি নতুন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই সে আমার বন্ধু হয়ে গেছে। আমি অবশ্য অন্যরকম হওয়ার পর সে আমার প্রথম বন্ধু।
তারপর এভাবেই বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। হঠাৎ আমাকে পাঠানো হলো পাগলা গারদে। সেখানে গিয়ে একটি লোক প্রচণ্ড জোরে আমাকে ইলেকট্রিক শক দিলো। তারপর ইনজেকশন দিয়ে আমাকে অজ্ঞান করল। জ্ঞান ফেরার পর আমি দেখলাম আমার সামনে বাবা আর ওই লোকটা কথা বলছে। তারপর আমাকে বাড়িতে আনা হলো। সবাই এখন আমার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করতে শুরু করলো। কেউ আমার থেকে দূরে—দূরে থাকে না, ভয় পায় না। সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। তারপর আমি ক্লাসে গিয়ে আবার দুই বন্ধুর কথায় জানতে পারলাম আমার এক কিডনি নষ্ট। আমি শুনে এবার একেবারে ভেঙ্গে পড়লাম। আমি বাঁচব আর এক বছর। আর আমি কোন পাগল ছিলাম না।
জুন মাসে আমার জন্মদিন। আর সেই জুন মাস থেকেই আমার একটু একটু করে সমস্যা হতে থাকবে। তো এভাবেই অনেক দিন কেটে গেল। শেষে এখন জুন মাস চলে এসেছে। আমি বুঝতে পারছি আমার সমস্যা হচ্ছে। কাল আমার জন্মদিন। কাল সবাই আমাকে উইশ করলো, গিফট দিলো, একটু কাঁদলো, তারপর বললো যে— তোমার যে সমস্যা হচ্ছে সেটা ঠান্ডা লাগা। শীতকালে তোমার ঠান্ডা লেগেছে। স্কুলেও একই অবস্থা। কিন্তু ওই নতুন আসা পা ভাঙ্গা ছেলেটি বললো— আমার গিফট তোকে পরে দেবো।
এক সপ্তাহ পরে সেই পা ভাঙ্গা নতুন ছেলেটি বললো— আজ তোকে গিফট দেবো। এটা বলে আমাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে গেল হাসপাতালে। সেখানে সে আমাকে এক ডাক্তারের সামনে দাঁড় করিয়ে চলে গেল। ডাক্তার আমাকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করল। জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম আমার পেটে অনেকগুলো স্টেথোস্কোপের মতো কী কী যেন। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম— কি হয়েছে? ডাক্তার বললো— এরকম বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমি বললাম— কেন? কি হয়েছে? তিনি জানালেন— সে তোমাকে তার এক কিডনি দান করেছে।