নিবন্ধ
Trending

ছোটদের বই, শিশুতোষ বই

স্বীকৃতি প্রসাদ বড়ুয়া

শিশুরা কল্পনাপর জগতে বাস করে, একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে। একটি মায়াবি পৃথিবীর কল্পনা তাদের চোখে ভাসে। নিজেদের মতো করে রূপকথাময় বা পৃথিবী কল্পনা করে সেই পৃথিবীতে বাস করে। আর শিশুদের বা ছোপদের উপযোগি সাহিত্যই হলো শিশুসাহিত্য।

সাধারণত ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মনস্তত্ব বিচেনায় রেখে শিশুসাহিত্য রচিত হয়। এ সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সহজ সরল ভাষায় শিশু মনস্তত্বকে মাথায় রেখে, শিশুদের কল্পনা, রোমাঞ্চ, জ্ঞান-বুদ্ধির উপস্থাপনা, রূপকথা, অ্যাডভেঞ্চার, ভূত-প্রেতের কাহিনিগুলোকে শিশুদের উপযোগী করে লেখার মাধ্যমে তুলে ধরা।

বিশ্বের অনেক বড় বড় সাহিত্যেকরা শিশুদের বা ছোটদের উপযোগী কালজয়ী রচনা সৃষ্টি করে গেছেন। যেমন হ্যান্স এন্ডারসনের ফেয়ারি টেলস, এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনস ক্রূসো, জোনাথন সুইফটের গালিভারস ট্রাভেলস, সারভান্তেসের দন কিহোতো, ট্রেজার আইল্যান্ড, ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড যুগ যুগ ধরে সব দেশের শিশুদের আনন্দ দিয়ে আসছে।

বাংলাভাষায় শিশুসাহিত্যের গোড়াপত্তন হয় ১৮১৮ সালে কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত নীতিকথা নামক বইটির মাধ্যমে। উপদেশমূলক আঠারোটি গল্পের সমন্ময়ে প্রণীত এই বইটি স্কুলপাঠ্যরূপে ব্যবহৃত হলেও প্রকৃতপক্ষে এটিই প্রথম শিশুপাঠ্য বই বলে স্বীকৃত।

শিশুসাহিত্য বা ছোটদের সাহিত্যের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, স্বর্ণকুমারী দেবীদের রচিত সাহিত্যের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বোধোদয়, কথামালা, চরিতাবলী, আখ্যানমঞ্জরী, বর্ণপরিচয়, অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ, মদনমোহনের শিশু শিক্ষা এবং স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত বালক পত্রিকা অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। রবীন্দ্রযুগের আগ পর্যন্ত শিশুসাহিত্য ছিল মূলত জ্ঞানসর্বস্ব, উপদেশমূলক ও নীতিকথামূলক। রবীন্দ্রযুগের শিশুসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হলো সাহিত্যের মধ্য দিয়ে আনন্দদান। রবীন্দ্রনাথের বিপুল বিশাল সাহিত্যসম্ভারের মধ্যে শিশুসাহিত্যও বিশেষ অবদান রেখেছে বাংলাসাহিত্যে। বিশেষ করে তাঁর সহজ পাঠ, শিশু কাব্যগ্রন্থ শিশুদের জন্য লেখা উৎকৃষ্ট রচনা।

রবীন্দ্রনাথের পর সমকালীন সাহিত্যিকদের মধ্যে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, কাজী নজরুল ইসলাম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিশুদের জন্য অনেক কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি করে বাংলা শিশুসাহিত্যে অবদান রেখে গেছেন।

হেমেন্দ্রপ্রসাদের আষাঢ়ে গল্প, যোগীন্দ্রনাথ সরকারের হাসিরাশি, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ভূতপেত্নী, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর টুনটুনির বই, সুখলতা রাওয়ের গল্পের বই, সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল, পাগলা দাশু, অবাক জলপান, কাজী নজরুল ইসলামের ঝিঙেফুল ইত্যাদি গ্রন্থ বাংলার শিশুসাহিত্য জগৎকে আলোকিত করেছে।

শিশুতোষ পত্রপত্রিকার মধ্যে মুকুল, প্রকৃতি, সন্দেশ, মৌচাক, শিশুসাথী, খোকা খুকু, শুকতারা, টাপুর টুপুর শিশুসাহিত্যের ধারাকে বেগবান করেছে।
বাঙালি মুসলমান শিশুসাহিত্যিকদের মধ্যে প্রথম দিককার লেখকদের মধ্যে মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী অগ্রগণ্য। তিনি নূরনবী নামে একটি মহৎ শিশুপাঠ্য জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। হাবিবুর রহমানের হাসির গল্প, ইমদাদুল হকের কামারের কাণ্ড, ইব্রাহিম খাঁর ছেলেদের শাহনামা, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর সিন্দাবাদ সওদাগরের গল্প, বন্দে আলী মিয়ার চোর জামাই, মেঘকুমারী, জঙ্গলের খবর, জঙ্গলের রাজা, মোহাম্মদ মোদাব্বেরের হীরের ফুল, হবীবুল্লাহ বাহারের ওমর ফারুক, আবুল কালাম শামসুদ্দীনের কচিপাতা শিশুদের জন্য রচিত উৎকৃষ্ট সাহিত্য। এরপর শিশুসাহিত্যের অঙ্গনকে যাঁরা আলোকিত করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন গোলাম মোস্তফা, পল্লীকবি জসীমউদদীন, কাজী কাদের নেওয়াজ, ফররুখ আহমদ, শওকত ওসমান, আতোয়ার রহমান ও হাবিবুর রহমান।

জসীমউদ্দীনের চলে মুসাফির একটি সুখপাঠ্য শিশুতোষ ভ্রমণ কাহিনী। বিজ্ঞানবিষয়ক বই লিখে বিশেষ খ্যাতিঅর্জন করেন আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন। তাঁর লেখা এসো বিজ্ঞানের রাজ্যে, অবাক পৃথিবী, খেলতে খেলতে বিজ্ঞান বেশ উন্নত মানের বিজ্ঞানমনষ্ক বই। বেগম সুফিয়া কামাল, আশরাফ সিদ্দিকী, রোকনুজ্জামান খান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রমুখ লেখক ছড়া, কবিতা, শিশুতোষ রচনা, কল্পবিজ্ঞানের মাধ্যমে শিশুসাহিত্যকে আধুনিক ধারায় নিয়ে গেছেন।

এছাড়া ছড়াসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে বাংলাদেশের অনেক খ্যাতিমান লেখক। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, ফয়েজ আহমদ, সুকুমার বড়ুয়া, আখতার হুসেন, লুৎফর রহমান রিটন, আসলাম সানী, আনজীর লিটন প্রমূখ।

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিশুসাহিত্য চর্চার বিষয়টি শুরু হয় স্বাধীনতার পরে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে। বিষয়বৈচিত্র্যে ভরপুর নানামাত্রিক শিশুসাহিত্য যেমন কবিতা, ছড়া, উপন্যাস, গল্প, নাটক, জীবনীগ্রন্থ, বিজ্ঞানবিষয়ক বই, বাংলাদেশ সিরিজ, অভিধান মিলিয়ে এ পর্যন্ত শিশু একাডেমী থেকে হাজারো গ্রন্থ প্রকাশ করে শিশুসাহিত্যের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শিশু বিশ্বকোষ শিশু একাডেমীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। এছাড়া এ প্রতিষ্ঠানের মাসিক পত্রিকা শিশু প্রকাশনার ৪৭ বছর পূর্ণ করছে এ বছর। বাংলা একাডেমীও শিশুতোষ নানামাত্রিক বই প্রকাশ করে বাংলা শিশুসাহিত্যের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানের মাধ্যমে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সারা বিশ্বের উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত বাংলাসাহিত্যে শিশু, দু খণ্ডে প্রকাশিত আকর্ষণীয় শিশু বিশ্বকোষ ছোটদের বাংলাপিডিয়া বিশিষ্ট কাজ। এছাড়া মুক্তধারা, অন্যপ্রকাশ, পাঞ্জেরী, কথাপ্রকাশ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য, সময়, অনন্যাসহ বিভিন্ন প্রকাশনী শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ করে শিশুসাহিত্যের ধারাকে বেগবান ও সমৃদ্ধ করেছে।

আগামী দিনে আমাদের শিশুসাহিত্য আরো উৎকর্ষ অর্জন করবে এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button