
‘মা’ উপন্যাস টি লিখেছেন দেশের অন্যতম খ্যাত নামা শ্রদ্ধেয় আনিসুর হক স্যার। কেউ একজন বলেছিলেন পৃথিবীতে দুইটা মা আছে। একটা ম্যাক্সিম গোর্কির আর অন্যটা আনিসুল হক স্যারের। ছোট বেলা থেকেই বইপড়ার প্রতি একটা প্রবল ভালো লাগা কাজ করে। আর সেই ভালো লাগা থেকেই কিছুদিন আগে আনিসুল হক স্যারের ‘মা’ উপন্যাসটি পড়েছিলাম। বইটি আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছে যে বইটি সম্পর্কে কিছু না লিখে পারলাম না।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন আজাদ ও তার মা সাফিয়া বেগম। আজাদ ছিলেন তার বাবা মায়ের এক মাত্র সন্তান । আজাদী আজাদী বলে যখন পুরো ভারত বর্ষ উত্তাল, ঠিক তখনই জন্ম হয়ে বলে তার নাম রাখা হয় আজাদ । ১১ জুলাই ১৯৪৬ সালে জন্ম হয় আজাদের। আজাদের বাবা ছিলেন ঢাকার সবচেয়ে বড় লোকদের একজন । ঢাকায় খুবই বিলাস বহুল জীবন যাপন করতেন তারা ।
কিন্তু এতো কিছুর পরেও যখন আজাদের বাবা ইউনুস চৌধুরী দ্বিতীয় বিয়ে করেন তখন আজাদের মা আজাদ কে নিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান । তিনি আর কোনদিনও স্বামীর কাছে ফিরেআসেন নি। আর এভাবেই শুরু হয় একজন সাধারণ নারীর অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প । আজাদের মা অনেক কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেন । ছেলে কে শিক্ষিত রুচীশীল ও মার্জিত করে গড়ে তোলেন । ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে আজাদ মাস্টার্স পাশ করেন । এমন সময় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। আজাদের বন্ধুরা আগড়তলা থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তারা আজাদ কে বলেন, তুই কি আমাদের সাথে যুদ্ধে যাবি ? আজাদ তখন বলেন, এই জগতে মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই এবং মায়েরও আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তাই মা যদি আমাকে অনুমতি দেয় তাহলেই কেবল আমি যুদ্ধে যেতে পারি । বাসায় এসে মায়ের কাছে যদ্ধে যাবার অনুমতি চাইলে মা বলেন, নিশ্চয়ই তুমি যুদ্ধে যাবে। তোমাকে তো আমি আমার জন্য মানুষ করি নি। তুমি দশের কাজে লাগবে, দেশের কাজে লাগবে এ জন্যই তোমাকে মানুষ করেছি ।মায়ের অনুমতি পেয়ে আজাদ বন্ধুদের সাথে যুদ্ধে যোগ দেয়। তারা ঢাকায় বেশ কিছু গেরিলা অপারেশন চালায় এবং সফল ও হয়।
১৯৭১ সালের ৩০ আগষ্ট রাতে আজাদের বাসা থেকে আজাদ সহ বেশ কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রেফতার করে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী। গ্রেফতার করে আজাদকে নেওয়া হয় রমনা থানায়। এরপর আজাদের মা কে বলা হয় আপনি আপনার ছেলেকে বুঝান। সে যদি সব স্বীকার করে নেয় তাহলে তাকে রাজ স্বাক্ষী বানানো হবে এবং মুক্ত করে দেওয়া হবে।পরদিন সকালে আজাদের মা রমনা থানায় যান ছেলের সাথে দেখা করতে। সেখানে আজাদের সাথে দেখা করে তিনি বলেন পুরো উল্টো কথা । তিনি ছেলেকে বলেন, শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোন কিছু স্বীকার করবে না।আজাদ তখন তার মা কে বলেন, ওরা অনেক মারে, মা। মা তখন ছেলেকে বলেন, তবুও তুমি স্বীকার করবে না, বাবা। এরপর আজাদ তার মায়ের কাছে ভাত খেতে চায়। আজাদ মাকে বলে,আগামীকাল আসার সময় ভাত এনো, মা। কয়েক দিন ভাত খাইনা ।
আজাদের মা পরদিন অনেক যত্নকরে রান্না করে ছেলের জন্য নিয়ে যান রমনা থানায় । কিন্তু দুঃখের বিষয় থানায় গিয়ে আজাদের মা আর ছেলেকে খুঁজে পান না। এরপরেও অনেক দিন আজাদের মা ভাত সাজিয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। কিন্তু ছেলে আর কোনদিন ফিরে আসেনি। আজাদের মা ১৯৮৫ সালের ৩০ আগষ্ট পর্যন্ত ১৪ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু এই চৌদ্দটা বছর আজাদের মা একটা রাতও বিছানায় ঘুমান নি। এমন কি একটা দিনও তিনি একদানা ভাতও মুখে তোলেন নি।
আজাদের মা, সাফিয়া বেগম ছিলেন একজনপর্বত সমান আত্মবিশ্বাসী এবং সংগ্রামী নারী। বিলাস বহুল জীবন ছেড়ে তিনি ছেলেকে নিয়ে নিদারুন দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন তবুও কারো কাছে মাথানত করেন নি তিনি । সাফিয়া বেগমের জীবনের শেষ ইচ্ছে ছিল তার কবরে লেখা থাকবে “শহীদ আজাদের মা”। আজাদ এক চিঠিতে তার মা কে লিখেছিল, যদি আমি পৃথিবীতে তোমার দোয়ায় বড় নাম করা হতে পারি তবে পৃথিবীর সবাইকে জানাবো তোমার জীবনী, তোমার কথা। আজাদের রেখে যাওয়া সেই অপূর্ণ কাজটাই যেন পূর্ণ হয়েছে আনিসুল হকের লেখা মা উপন্যাসের মাধ্যম।
একজন মাতার এক মাত্র সন্তানকে দেশের জন্য কীভাবে কুরবানী করেছেন যুদ্ধের সময় তারই জলন্ত দৃষ্টান্ত দেখতে পাই আনিসুল হক স্যারের‘মা’উপন্যাসে। এমন হাজারো মার আত্মত্যাগ আর স্বেচ্ছায় সন্তান উৎসর্গের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের মহান স্বাধীনতা।
বইটি পড়ার সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নি। আজাদ এবং তার মায়ের সম্পর্কের যে জাল লেখক তার কলম দিয়ে বুনেছেন তা সত্যি মন ছুয়ে যায়।
মোছাঃ তাজকিয়া আক্তার
দশম শ্রেণি, রোলঃ ০১
হুয়াকুয়া দ্বি—মুখী উচ্চ বিদ্যালয়,
সোনাতলা, বগুড়া।