
“Words which is inside a book, have the power to change us.”
-Tony Morrison
মানব সভ্যতার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদ্ভাবনামূলক নিদর্শন হচ্ছে বই। সেই কোন আদিকালে গুহার ভিতরের দেয়াল, শিলাপট, গাছের বাকল, প্যাপিরাস, চামড়া ইত্যাদি কত বিকল্প উপকরণ হয়ে শেষাবধি কাগজের মোড়কবন্দী হয়েছে বই। রবীন্দনাথ ঠাকুর, সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রমথ চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ থেকে হাল আমলের এমন কোন লেখক নেই যিনি বই নিয়ে কিছু না কিছু প্রসঙ্গে কথা না লিখেছেন। বই যেন কাগজের পৃষ্ঠায় জমে থাকা জ্ঞানের মধুরস।
এক বা বহুধরণের স্বপ্ন যেন বই এর মাধ্যমে আমাদের হাতে ধরা থাকে। এক লেখককে বলতে শুনেছি যে, ভালো কোনো বই পড়া হলে, তার কাছে জগতের একটি আলোর জালানা খুলে যায়। কোন মানুষের ধীশক্তি যাচাই করার জন্য, সে কি কি বই পড়ছে, এ প্রশ্ন জিগ্যেস করলেই জানা যায়। মার্ক টোয়েন বই পড়ার অনুভূতি সম্পর্কে বলতেন, একটি ভালো লাইব্রেরীতে গেলে আমার অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হতো। মনে হতো, এতে রাখা বইগুলোর মধ্যকার জ্ঞান যেন আমার সারা দেহে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে, এমনকি কোন একটি বইও না খুলেও এই অনুভূতি হতো। তিনি আরও বলেছেন যে, বই হচ্ছে তাদের জন্য যারা অচেনা পৃথিবীতে থাকতে চায় না।
বইকে কেউ মানুষের স্বাধীন সত্তা হিসেবে গণ্য করেছেন। কেউ বা আদর্শ জীবনের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন যে, ভালো বই, ভালো বন্ধু ও মগ্ন চৈতন্য তার কাছে উৎকৃষ্ট বলে মনে হয়। মার্কিন মুলুকের বিশ্বখ্যাত ডিজনিল্যান্ডের স্থপতি ওয়াল্ট ডিজনি বলেছেন যে, ট্রেজার আইল্যান্ডে জলদস্যুদের যত গুপ্তধন লুকোনো ছিল, একটি ভালো বইয়ের পাতায় পাতায় তার চেয়ে বেশী গুপ্তধন সঞ্চিত রয়েছে। কেউ বা বলেছেন যে, বই এর ক্ষমতাকে কখনো খাটো করে দেখা উচিত নয়।
বিশ্বখ্যাত লেখক উমবার্তো ইকো বলেছেন যে, বই এর কথাগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে এমন কথা নয়, তবে বই দিক নির্দেশনা দেয় যে, তুমি এসব ঘটনাকে তদন্ত করে দেখো। আগে ভাবতাম যে, প্রতিটি বই এমন বিষয়ের কথা বলে যা হয় মানুষ সম্পর্কিত বা অলৌকিক কোনো অলীক বস্তু অথবা বস্তজগতের কথা যা বইয়ের বাইরে থাকলেও অজানাই থাকে। কিন্তু এখন আমার উপলব্ধি হয় যে, হয়তো বই অনিত্য হলেও অন্য বই সম্পর্কে কথা বলে। শুধু তাই নয়, একটি বই আরেকটি বইয়ের সাথে পরষ্পর কথা বলে। বাক্য বিনিময় করে। এ ধরণের গোপন সংলাপ লাইব্রেরীতে গেলে আমি অনুভব করি। এটি তখন এমন এক স্থানে পরিণত হয়, যেখানে শতাব্দী কালের প্রাচীন গ্রন্থগুলোর পারষ্পারিক গুঞ্জন, একটি বইয়ের পাতার সাথে অপর একটি বইয়ের পাতার অবোধ্য সব সংলাপ নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়। কখনো মনে হয় একটি বই আরেকটি বইকে সরিয়ে তার যায়গায় নিজেকে স্থাপন করার লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হয়েছে। যে ক্ষমতা কোন মানুষের মন দ্বারা আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। দখল করাও সম্ভব নয়। যেন গুপ্ত কোন ট্রেজার এর উৎস থেকে অসংখ্য মনের চেতনাগুলো প্রবহমান রয়েছে। বহুকাল আগে যারা এসব গ্রন্থ রচনা করেছে, যেন তারা তাদের মৃত্যুকে তাদের অমরত্বকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে অনন্তকাল ধরে।
মানুষের সব স্বপ্নগুলো যেন একেকটি গ্রন্থের পৃষ্ঠা এবং বই হলো আর কিছু নয় স্বপ্ন থেকে উঠে আসা চেতনা। একটি বই পড়লে যে উপলব্ধি হয়, তা থেকে সেই লেখককে, তার সম্প্রদায়, জাতি ও গোষ্ঠী সম্পর্কে জানা যায়।
শিশুর জগতকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশী। বই শিশুকে পাঠ করার জন্য গোপনে নির্দেশনা দেয়। এতে সে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।
বই এক অর্থে গোটা পৃথিবীরই খন্ড খন্ড ভাষ্য বা বর্ণনা। একে উপেক্ষা করলে পৃথিবীই তার কাছে অচেনা ও অজানা থেকে যাবে। কাজেই বই পড়তে হবে, কিন্তু স্বরণ রাখতে হবে যে বই বই—ই। শিখতে হলে নিজের চিন্তাভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। বই ভালোও হয়, আবার খারাপও হয়। ভালো বই হচ্ছে পৃথিবীর নৈতিকতার সংকেত। আর মন্দ বই হচ্ছে পৃথিবী তথা মানুষের অনৈতিকতারই সাংকেতিকতা।
লাতিন আমেরিকার বিশ্বখ্যাত লেখক হর্হে লুই বোর্হেস বই সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার সব সময় মনে হয়, বেহেশত্ হয়তো—বা এক ধরণের অনিন্দ্য লাইব্রেরীর মতোই।’ ভালো বই প্রথমে পড়ে ফেলা উচিত, নইলে সারাটা জীবন হয়তো আর পড়ার কোনো সুযোগই হবে না, বলেছেন এক লেখক। একজন লেখক বইয়ের পাঠককে দুভাগে ভাগ করেছেন। এক দল পড়েন মনে রাখার জন্যে। আরেক দল পড়েন ভুলে যাওয়ার জন্যে। বিখ্যাত লেখক অস্কার ওয়াইল্ড এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন যে, আগে বিখ্যাত লেখকেরা বই লিখতেন আর তার পাঠক ছিল জনগণ। আর এখন যে কেউই লেখেন বই আর যার কোন পাঠকই নেই।