
আগামীকালের স্কুলের সব পড়া শেষ করে সাইরা। ওর বড়বোন যারিন। সাইরার স্কুল ব্যাগে বই, খাতা ও পেনসিল গুছিয়ে রাখে। ব্যবসায়ী সেলিম রেজা খান ও গৃহিণী আফসারী রেজার দুই কন্যা যারিন আর সাইরা। দু’বোনই পড়াশুনায় খুব ভালো। বড়বোন যারিন দশম শ্রেণি ও ছোটবোন সাইরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। যদিও দু’বোনের ভেতর ছোট সাইরা একটু বেশি চটপটে। আর বড়জন বেশ নরম স্বভাবের। তারপরও দু’বোনের খুব ভাব। একে অপরের জানও বটে।
রাতের খাবার খেতে টেবিলে যেতে বলে ওদের মা। দু’বোন একই সাথে উত্তর দিয়ে বলে, বাবা এলে একসাথে খাব। মা একটু রেগেই বলে- ‘তোমাদের বাবার ফিরতে দেরি হবে, তোমরা খেয়ে নাও। সকালে স্কুল আছে তোমাদের।’ কি আর করা, মা বলেছে যখন দু’বোনকে খেতেই হবে এখন। চুপ করে টেবিলে এসে খেতে বসে দু’বোন।
খাওয়া শেষ হতে না হতেই বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সাইরা অমনি বলে- ‘মা, বাবা আসবে কখন?’ মা সাইরার দিকে তাকিয়ে বলে- ‘চলে আসবে কিছুক্ষণের ভেতর; রওনা দিয়েছে। কেন?’
‘না, এমনি।’… বলতে না বলতেই কলিংবেল বেজে উঠল। যারিনের খাওয়া শেষ। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল। সেলিম সাহেব ভেতরে ঢোকে। যারিনকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে- ‘আমার ঘরের প্রাণটা কী করে!’ ঘরের প্রাণ সাইরা ততক্ষণে খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। দু’জনকে জড়িয়ে ধরে ঘরে আসে সেলিম সাহেব। তার দু’মায়ের সাথে বেশ কিছুক্ষণ খুনসুটি করে।
ওদিকে ওদের মা টেবিল গুছিয়ে খাবার খেতে ডাক দেয় সেলিম সাহেবকে। সেলিম সাহেবও হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে যায়। তখনও বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে অবিরাম।
খেতে খেতে ওদের দু’বোনকে ঘুমাতে যেতে বলে সেলিম সাহেব। কথামতো দু’জনই ঘরে গিয়ে বিছানা ঝেড়ে শুয়ে পড়ে। সেলিম সাহেবও খাওয়া শেষ করে। আর আফসারী রেজা থালা—বাসন গুছিয়ে ঘরে চলে যায় ঘুমাতে। সেই কাকডাকা ভোরে উঠতে হয় তাকে। ভোরে দু’মেয়েকে উঠানো। এরপর গুছিয়ে, টিফিন বানিয়ে স্কুলে পাঠানো। তার ওপর রয়েছে নাস্তা বানিয়ে সেলিম সাহেবকে খাইয়ে অফিসে পাঠানো। এসব করতে রোজ বেশ ধকল পোহাতে হয় তাকে। তাই বেশি রাত না করে ঘুমিয়ে পড়ে সে। সেলিম সাহেবও সারাদিন ব্যস্ত সময় পার করে। ফলে বেশি রাত করে ঘুমায় না। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও দুবোন ঠাই জেগে আছে না ঘুমিয়ে। বাইরে তখনো ঝমঝমানো বৃষ্টি। এর ভেতর একটা ছোট বিড়ালছানার মিঁউ মিঁউ করুণ ডাক ভেসে আসছে। এ কারণে দু’বোন কিছুতেই চোখের পাতা এক করতে পারছে না।
বৃষ্টি যত বাড়ে, ডাকটাও তত বাড়ে। এতে করে দুবোনের মনের ভেতরটা কেমন উতলা হয়ে উঠল। সাইরা বড় বোনকে কনুইয়ের হালকা গুঁতো দিয়ে বলল- ‘শুনেছো আপু, একটা বিড়ালছানা ডাকছে সেই কখন থেকে!’ যারিন উত্তরে বলল- ‘হ্যাঁ তো, অনেকক্ষণ ধরে শুনছি। হয়তো আমাদের বাসার নিচের সেই বিড়ালছানা হবে।’ কদিন আগে বাসার নিচে গাড়ি গ্যারেজে একটা মা—বিড়াল পাঁচটা ছানা দিয়েছে। রোজ স্কুলে আসা—যাওয়ার পথে ওরা দেখে। ছানাগুলো বেশ সুন্দর দেখতে। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে আদর করে দু’বোনে। হুট করেই সাইরা শোয়া থেকে উঠে জানালার কাছে যায়। জানালা খুলে বিড়ালছানাটাকে দেখার চেষ্টা করে। কোনোকিছু দেখতে না পেয়ে আপুকে ডাক দেয় ও। যারিনও দেখতে ব্যর্থ হল। তবুও চারচোখে চেয়ে রইল বাইরের দিকে। দেখতে পেল না কিছুই। বৃষ্টিও বাড়ে; ডাকও বাড়ে। বেড়েই চলে…।
ওদিকে সেলিম সাহেবও আলতো ঘুমের মাঝে বিড়ালছানাটির ডাক শুনতে পায়। দু’বোন আর অপেক্ষা না করে বাবা—মায়ের দরজায় টোকা দিতে থাকে…।
কয়েকটি টোকা দেবার পর বাবা দরজা খুলে কিছু বলার আগেই সাইরা বলেÑ ‘বাবা বাবা, বাইরে একটা বিড়ালছানা মিঁউ মিঁউ করে ডেকেই যাচ্ছে।’
বাসার উত্তর দিক থেকে একটা গলিপথ গিয়েছে সোজা রেললাইনে। বাসার ওই দিক বরাবর একটা বড় বেলকনি। যেখানে দাঁড়ালে ওপথটা বেশ ভালো মতোই দেখা যায়। তিনজনই বেলকনি থেকে বৃষ্টির ভেতর বাইরের দিকটা দেখতে চেষ্টা করল। তেমন কিছুই দেখতে পেল না তারা ।
হঠাৎ সাইরা জোরে বলে উঠল, ‘বাবা বাবা, ওই দেখো ওই বাড়ির গেটের কোণায় বিড়ালছানাটি।’ পেছনের বাড়ির গেটের কোণায় বিড়ালছানাটিকে দেখে সেলিম সাহেবের বেশ মায়া হয়। একা একা ভিজে যাচ্ছে ছোট্ট ছানাটি। ওরা তিনজন অপলক তাকিয়ে থাকে…
তাকিয়ে থাকতে থাকতে সাইরা হুট করে বলেই ফ্যালে- ‘বাবা, ওকে বাঁচাও না। ও তো মরে যাবে!’ মেয়ের কথা শুনে সেলিম সাহেবের বুকের ভেতরটা কেঁদে ওঠে। আর মনে মনে ভাবতে থাকে নিজের মেয়ে দুটোর কথা।
মেয়ের কথা শুনেই সেলিম সাহেব ছাতা নিয়ে বের হয়। বিড়ালছানাটিকে বাঁচাতে হবে।
যারিন আর সাইরা বেলকনি দিয়ে তাকিয়ে থাকে বিড়ালছানাটির দিকে। ততক্ষণে সেলিম সাহেব পেছনের পথে গিয়ে বিড়ালছানাটিকে তুলে নিয়ে আসে। ছানা নিয়ে ফিরতেই সাইরা ধরতে গেলে ছানাটিকে একটু উঁচুতে তুলে সেলিম সাহেব ধরতে না করে। সোজা বাথরুমে ঢুকে ছানাটিকে রেখে বেরিয়ে আসে সেলিম সাহেব। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে পানি গরম করতে দিয়ে আসে। বিড়ালছানাটির মিঁউ মিঁউ ডাকে আফসারী রেজাও ঘুম থেকে জেগে যায়।
বিছানা থেকে উঠে এসে দেখে বাবা—মেয়েদের ছোটাছুটি। ওদিকে গরম পানি দিয়ে বিড়ালছানাটিকে ভালো করে সাবান দিয়ে গোসল করায়। শরীর ভালো করে মুছিয়ে একটা পুরাতন কাপড়ে জড়িয়ে সাইরার কোলে দিল বিড়ালছানাটিকে। ছানাটিকে কোলে নিয়ে দু’জনে খুশির বানে ভাসতে থাকে। সেলিম সাহেবের এমন কাজ দেখে হতবাক হল সাইরার মা। কিছু বলার আগেই সেলিম সাহেব ঘটনাটা খুলে বলে। শুনে মৃদু হাসি দিয়ে মেয়েদেরকে ঘুমাতে যেতে বলে। বিড়ালছানা নিয়ে দু’বোন শুতে যায়। দু’জন খুশিমনে ছানাটিকে ‘ওরে আমার পুতুনা, পুতুনা’… বলে আদর করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে।
আর ওদের পুতুনাটিও কোমল বিছানা পেয়ে গরগর শব্দ তুলে ঘুম যাচ্ছে।