গল্প

প্রজাপতি হয়ে গেল ফারিফ্তা

শোয়েব শাহরিয়ার

বিয়ের সাড়ে তের বছর পর হঠাৎ আনন্দ ঝলকানির মত কলাবতীর কোল জুড়ে পূর্ণিমার বাড়ি। রাত নেই দিন নেই, শুধু আলোর ফোয়ারা। বাড়িটাকে ওড়াচ্ছে আকাশে, মেঘে মেঘে দোলাচ্ছে, বিলের পদ্মপাতার শিশির আর জলের যৌথ আলিঙ্গনে কোল-বাড়িটা ভাসাচ্ছে। কলাবতীর কোল যেন শান্তিমহাল।

কোলে কোলেই ফারিফ্তা পানপাতার মতো খোল ছড়ালো, মাদুর-কাঠির মতো দিংলে হলো, গোলআলুর মতো ট্যাপা চোখ নক্ষত্রের মতো মিটমিট করলো, হরিণ শাবকের মাসবিহীন কাঠি কাঠি হাত-পাগুলো দ্রুত ছাদমুখ উথাল-পাথাল করলো আর রাইস কুকারের তীব্র শিসের মতো হাসি খলবল করলো ফুল ফোটা থেকে ঝরে পড়া পর্যন্ত। আহা! সে এক দ্বিতীয় স্বর্গ বরফ-গলা জোছনার সুড়ঙ্গ বেয়ে নেমে এসেছে ফারিফ্তার যেদিন কমলা-ধোওয়া পা পৃথিবী স্পর্শ করল, প্রান্তর যখন ক্ষুধার্ত বুক খুলে দিল এবং বালিকা ঘাসগুলো জমানো আদর ঢেলে দিলো, তখন ফারিফ্তা দেড় বছরের পাখির ছানা- ঘুটঘুট ফুটফুট- ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ- বা-বা, বা-বা চিৎকার করে মাঠে বলের পেছনে ছুটছে মেসির মতো কিরু করছে আর দৌড়াচ্ছে আর মাঝে মধ্যে মাঠে যত পড়ে থাকা, ফেলে দেওয়া বিড়ি-সিগারেটের মুথা, চকলেটের ফেলা দেওয়া পলিথিন কভার, শুকনো ঘাস-পাতা কুড়ানো তার বেজায় মজা, মুখে দিতে পারলে আরও মজা, বাবা-মা’র চোখা চোখ এড়াতে পারলে ধা করে তো সোজা মুখের ভেতরে। শীতের সকালে ঠান্ডা-জড়ানো অপুষ্ট দাঁত, কুচকুচে কামড়ে দিতে বেজায় পটু, ঐ নিষিদ্ধ খাদ্যগুলো ভেতরে ঢুকে যাবার সাথে সাথেই দুধে দাঁতগুলো আনন্দে নেচে ওঠে। কিন্তু বাবা-মার ভয়ে নিশ্চুপ মহড়া, মুখ খোলে না।

ফারিফ্তা দেড় বছরেই খাদ্যি-খাবারে রুচির ভিন্নতা প্রমাণ করেছে। শক্ত খাবার শুরুর দিকে ডিম তার ছিল পয়লা পছন্দ- ফেবারিট। সিদ্ধই হোক আর পোচই হোক, এক নিঃশ্বাসেই সাবাড়। সাদা অংশ হোক বা কুসুমটুকুই হোক- কোৎ কোৎ। মাস দুই-আড়াই পরই মার মুখে অভিযোগ উঠলো, সাদাতে আর জমছে না, উগরে দিচ্ছে। চাপাচাপি করলে ডিম বেচারির আর মর্যাদা থাকছে না, বিশেষত সাদা অংশে, তবে কুসুমে জিভের ছটকানির শব্দ বেশ তৃপ্তিকর। তেমনি কলাতেও, তবে সে কলাখানা হওয়া চাই শবরী এবং মজানো। কলা-প্রেম যখন ওর তারার সা-তে তখন তার ছটফটানি এমন যে মাকে ছুলতে দেবার দমও দিতে নারাজ, মুখে পোরা মাত্রই নবীন দাঁত আর জিভের চরকায় পিষে পিষে চালান শেষে বাবার দিকে তাকিয়ে ফোকলা মুখে জগৎ পটানো হাসি। জিভের ছোটখাটো চত্বরে এবং তরমুজের বিচি-দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে কলার ভগ্নাংশও খুশিতে ডগমগ। কিন্তু ফারিফ্তা বলে কথা, রুচিতো পাল্টাতে হবে। বয়সও তো দেখতে দেখতে কম হলো না, ষো-ল-মা-স! ইতিমধ্যেই চিমটি সমান শিং গজে উঠেছে ভেতরে, যাকে অভিধানের ভাষায় ‘পার্সোনালিটি’ বলে, ঐ শিং গুঁতো মেরে মা’কে কলা ছুলতে দেয় না, তেরসা ভাবভঙ্গিতে বুঝায় যে সে নিজেই যথেষ্ট, আয়নার চিড়-ধরা চিৎকার এবং কলাখানা দখলে নিয়ে নিজের হাতেই ছুলে খায় কি খায়না, দশ আঙুলে মেখে-টেকে প্যাচাপ্যাচা কাদা বানায়। খাওয়ার চাইতে কলার ওপরে অধিকার খাটানো ফারিফ্তার বেশি আনন্দ।

দুটো বিষয়ে ওর নেশা, মাঠে বল নিয়ে ছুটাছুটি, আর মাঠের শেষের ফুলের বাগান। বলের পিছে দেড় বিঘত স্প্রিংয়ের পা ছুটছে, যেন সার্কাসের ওস্তাদ ছাগশিশু। ছুটছে দিশাহীন, বাবাও পিছেপিছে। বাগানের কাছাকাছি এলেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়, কিছুক্ষণ বল ভুলে যায়, বাবা ভুলে যায়। অবাক হয়ে এত্তোএত্তো ফুল দেখে। শ্যামলা বর্ণের তুলতুলে একটা হাত তুলে মনে হয় ধরতে চায়। ফুলগুলো কি ওকে ডাকে? ফুল হয়ে ডালে দুলতে বলে? একবার পেছনে বাবাকে দেখে নেয়- বাবা অনেকটা পেছনে। ফারিফ্তা ধীরে ধীরে আলতো পায়ে ফুলপাড়তে দুঃসাহস করে। অমনি দূর থেকে কর্কশ তাতানো স্বর: এই- ফুল ছিঁড়বে না, ঢুকবে না, ঢুকবে না। মাঠের দিকে মুখটা ফিরিয়ে লাউড স্পিকারের তর্জন- এ বাচ্চাটা কার? তাড়াতাড়ি এসে নিয়ে যান। ফুল ছিঁড়লে সর্বনাশ হবে।’

বাবা কাছে এসে বললেন, ‘বাচ্চা মানুষ, এতগুলো ফুল এক সাথে ও কখনো দেখেনি।’ ঠিক আছে, ওকে নিয়ে যাচ্ছি।’
কেয়ারটেকার সাহেব কন্ঠে একটু বিরক্তি মিশিয়ে বলল, ‘মেয়র সাহেব বড় রাগী মানুষ। আর এ-বাগানটা স্যারের বিশেষ প্রজেক্ট। লক্ষলক্ষ টাকা খরচ করে সারা দেশের মধ্যে এক নম্বার বাগানটা তৈরি করতে চান।’
হঠাৎ ফারিফ্তা বাসার মত এখানেও টুকি-ঝাৎ খেলতে চায় বাবার সাথে। ফুল গাছের আড়ালে আড়ালে। সে ফুলের আবডালে, ছায়াতে লুকোবে আর বাবা তাকে খুঁজে খুঁজে বার করবে। খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে পড়ে বাবা। তারপর হঠাৎ আবিষ্কার-তারপর এক পশলা ঝড়ো আনন্দ এবং ফুল কাঁপানো ও ফোটানো হাসির উছলে-ওঠা। পাপড়ির সাথে, রংয়ের সাথে, গন্ধের সাথে, প্রজাপতির সাথে একটু ভাব করতে চায়।
একটু দূর থেকে দাঁড়িয়ে ফারিফ্তা অনেক ফুলের ডাক শোনে, হাতছানি দেখে, এক সাথে যেন কলকলিয়ে হেসে ওঠে ওরা, উড়তে চায়, পাখা ঝাপটায়, গান গায়, ওকে ডাকে আর বাতাসে দোল খেতে খেতে নেচে ওঠে, এসো, এসো ফারিফ্তা, এসো গান করি, পাখি হই, নেচে নেচে উড়ে বেড়াই, এসো!

একটু একটু করে ফারিফ্তা ফুলের কাছে এসে দাঁড়ায়, একদম কাছে। ওরা সবাই এক সাথে ‘ওয়াও’ বলে হৈহৈ করে ওঠে। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নাচতে থাকে গাঁদা, স্টার, গোলাপ, কসমস, দালিয়া, রঙ্গন, শেফালি সবাই এসে যেন ওকে ঘিরে ধরেছে। চোখে-মুখে-ঠোঁটে-গালে-চুলে চুমু খাচ্ছে, আদর ঢেলে সুগন্ধি ছোট গতরে মেখে মেখে মেতে ওঠে। ফারিফ্তা দু’চোখ বন্ধ করে ওদের সোহাগে, আদরে ভরে গেছে যেন, স্বপ্ন হয়ে গেছে যেন, উড়ছে যেন পাখা দোলাতে দোলাতে। এক সময় কচি-মন বুঝল ফারিফ্তাও ওদের সাথে কোনো এক ডালে গোছা ফুল হয়ে ফুটে আছে। বাতাসে দুলছে। বাবা ভুলে গেছে সে।
বাবা এসে ওর পিঠে ভালবাসার ওম মাখানো হাত রাখলো, ফারিফ্তা তখন ফুলপরীর রাজ্য থেকে ফিরে এল। বাবা দেখলো ওর দুই তালুর আঁজলা ভর্তি ফুল আর ফুল।

হনহন ছুটে এসে দজ্জাল কেয়ারটেকার ফারিফ্তার আঁজলা ভর্তি ফুল দেখে সেকি চিৎকার- আমি জানতাম ও ফুল নষ্ট করবে। আপনি শুনলেন না। ফুল ছিঁড়ে গাছগুলো শ্যাষ করে দিছে। গাছগুলান আর বাঁচবে?
বাচ্চামানুষ, অতশত ও কি বুঝে?
ও তো বোঝে না। আপনি তো বুঝেন। কী সব্বোনাশ যে করে থুয়ে গেলেন।
ফারিফ্তা যেন সব বুঝে ফেলেছে। কাঁদতে কাঁদতে আঁজলা-ভরা ফুল নিয়ে বাগানের ভেতর ঘাসের ওপর ঢেলে দিল। তারপর বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। কী ভাবলো কে জানে। তারপর একটা একটা করে আঙুল তুলে কোনো এক ডালে লাগানোর চেষ্টা করতে থাকলো। পড়ে যায়, আবার তোলে, লাগায়, পড়ে যায়, আবার তোলে… আবার…আ-বা-র… তারপর মনে হয় ব্যর্থতায় কেঁদে দেয়। অনেকক্ষণ কাঁদে- বাবা দূর থেকে দেখে।

এক সময় মিনি ফারিফ্তার চোখ হঠাৎ চমকে ওঠে, থমকে যায়, দেখে প্রজাপতি, উড়ে উঠছে, মাটি থেকে, প্রজাপতি- একটা-দুটো-তিনটা-চারটা…অনেকগুলো…প্রজাপতি… সে কিচ্ছু বোঝে না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে এবং দেখে…ঘাসের ভেতরে ফেলে দেয়া ফুলগুলো এক এক করে প্রজাপতি হচ্ছে আর উড়ে যাচ্ছে, সে কিচ্ছু বোঝে না, শুধু দেখে যায় আর খুশিতে হাততালি দেয়। এবং দেখে, দেখতে থাকে।

পেছনে দাঁড়িয়ে বাবা। তার চোখ ভিজে যায় এবং চোখের জলে বাবাও অজস্র প্রজাপতি উড়তে দেখে। উড়তে থাকে
অ-নে-ক প্রজাপতি। অজস্র… শতশত… হাজার হাজার… আকাশভর্তি ..অগুণতি প্রজাপতির মধ্যে ফারিফ্তাও প্রজাপতি হয়ে উড়ে যায়… দূরে… অন্য কোথাও… আকাশ-নীলের হাসিতে মেঘের কোলে… প্রজাপতি হয়ে ফারিফ্তা উড়ে যায়… উড়তে থাকে… ভাসতে থাকে…

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button