
এতিমখানায় রাফিয়ার আর ভালো লাগে না। কারণ তার জানালায় পাশে একটা টিয়াপাখি নিয়মিত আসত। রাফিয়া ইশারায় মাথা নড়াতে নড়াতে টিয়াপাখির সাথে অনেক কথা বলত। কিন্তু কয়েক দিন ধরে আসছেন না পাখিটা। কেন আসছে না? কী হলো ওর? ভীষণ চিন্তায় পড়েছে রাফিয়া। পাখিটার খোঁজ কার কাছে থেকে নেবে; তার তো কোনো বন্ধু পাখি নেই। সে তো একাই আসত। রাফিয়ার পক্ষে তো কোথাও গিয়ে খোঁজ নেওয়া সম্ভব না। কারণ এতিমখানায় সে নিজেই বন্দি।
রাফিয়া ভীষণ মন খারাপ করে ভাবল- সবাই আমাকে পর করেছে, শেষ পর্যন্ত পাখিটাও পর করে চলে গেল। আমার আপন বলতে আর কেউ থাকল না। এই বলেই রাফিয়া জানালার গ্রিল ধরে কান্না করছে। তার বন্ধুরা কাছে এল। তাকে সান্ত্বনা দিল। কিন্তু সে স্বস্তিপ্ত পেল না। তার কান্না দেখে মিতা নামের এক বন্ধু রেগে বলল, ‘কান্না করলে কিন্তু তোকে বের করে দেব। আমরা বাবা-মায়ের জন্য কান্না করি না, আর তুই এক পাখির জন্য কান্না করছিস। আমরা তো এতিম। আমাদের প্রতি কার মায়ামমতা আছে! কারও নাই। তাই আমাদের উচিত কারো প্রতি মায়ামমতা না দেখানো। তুই চুপ থাক।’
রাফিয়া তার কথার কোনো প্রত্যুত্তর করল না। তার মন আরও ভীষণ খারাপ হলো। সে ভাবল- এতিমখানায় থাকবে না। কেউ যদি তাকে নিয়ে বাসাবাড়িতে কাজ দেয় তাহলেও সেখানে গিয়ে কাজ করবে। তবু এতিমখানায় থাকবে না। কিন্তু কার মাধ্যমে কোথায় যাবে? এখানে সবাই পর। কে মুক্ত করে নিয়ে যাবে।
রাফিয়া নানা কিছু ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল। সে স্বপ্ন দেখছে আজ তার জন্মদিন। তার বাবা-মা এসেছেন। তাদের সাথে জন্মদিনের কেক কাটছে। রাফিয়া মহাখুশি। ভোরে তার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙাতে সে বিরক্ত হলো। আজ আরও কিছু সময় যদি সে ঘুমাতে পারত তাহলে বাবা- মার সাথে কত কথা বলতে পারত। বেশ ভালো সময় কাটত তার। কিন্তু সে সৌভাগ্য হলো না রাফিয়ার। ঘুম ভাঙার পর সে জানালার কাছে গেল। গ্রিল ধরে দাঁড়াল। একটু পর দেখে তার সেই টিয়াপাখিটা ছোট্ট একটা বাচ্চা পাখি নিয়ে হাজির। ছোট্ট পাখিটা একটু একটু উড়তে পারে। রাফিয়া দেখে বুঝতে পারল এত দিন টিয়া পাখিটা কেন ওর কাছে এসেনি। কারণ বাচ্চা হওয়ার জন্য সে হয়তো আসতে পারেনি। ভাবল, আমি ভুল বুঝেছিলাম। রাফিয়া হাত জোর করে পাখির কাছে ক্ষমা চাইল। রাফিয়ার সামনে ছোট্ট পাখিটা নাচানাচি শুরু করল। ওর অনেক বন্ধু পাখির নাচ দেখতে এল। ছোট্ট পাখির নাচ দেখে রাফিয়ার মন ভালো হয়ে গেল। খুশিতে পাখিটাকে ধরতে চাইল সে। কিন্তু ধরতে পারল না। টিয়া পাখি বলল, ‘আজ যাই রাফিয়া।’
রাফিয়া বলল, ‘তাড়া থাকলে যাও। তবে এখন থেকে নিয়মিত আসবে কিন্তু।’
‘অবশ্যই আসব। তুমি আর মন খারাপ করবে না।’ এই বলে পাখি দুটো উড়ে গেল। রাফিয়ার ইচ্ছা হলো ওদের সাথে উড়ে যেতে। কিন্তু রাফিয়ার যে ডানা নেই।