
তোমরা কি মেলায় যাও? কত ধরনের মেলা হয় বাংলাদেশে! বৈশাখীমেলা, বিজয়মেলা, পৌষমেলা, বস্ত্রমেলা, হস্তশিল্প মেলা, কুটিরশিল্প মেলা… আরো কত কত মেলা! সব মেলাতেই কমবেশি হাতে তৈরি খেলনা, নানা তৈজসপত্র, কাপড়সহ নানান কিছু পাওয়া যায়। এসব দেখতে কিন্তু খুব ভালো লাগে তাই না? কখনো এসব ‘হস্তশিল্প’ নামে বিক্রি হয় আবার কখনো ‘কুটিরশিল্প’ নামে। আচ্ছা, এই হস্তশিল্প আর কুটিরশিল্প ব্যাপারটা কি এক, নাকি আলাদা কিছু? কী মনে হয় তোমাদের? আজকে আমরা জানব এসব নিয়েই।
সুন্দর যেকোনো কিছুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরদিনের। সুন্দরের প্রতিএই আকর্ষণ থেকেই শিল্পের জন্ম। শিল্পের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Art । ল্যাটিন Ars এবং Artem থেকে Art শব্দটির উদ্ভব। শিল্প শব্দটি আকারে ছোট হলেও এর অর্থ কিন্তু অনেক গভীর! শিল্প শব্দটির মূল ভাবার্থ হলো সুন্দর। Art বা শিল্প মানসিক চাহিদা, স্বস্তি ও আনন্দ বিধানের তাগিদে মানুষের জীবনকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর করার চেষ্টা করে চলছে। শিল্প সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমেই ‘শিল্পী’ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখতে হবে। কে এই শিল্পী বলো তো? কাকে বলা যাবে শিল্পী? ‘শিল্পী’ শব্দটি নিয়ে কিন্তু ব্যাপক মতভেদ রয়েছে! যেমন, প্রচলিত অর্থে শিল্পী বলতে বোঝায় শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত বিখ্যাত মানুষজনকে। কিন্তু আসলেই কি তাই? তুমি যদি চারদিকে তাকাও দেখবে, শিল্পীরা বাস করেন আমাদের আশেপাশেই। যে মানুষটি প্রতিষ্ঠিত নন, অথচ মনের আনন্দে সুন্দর কোনো কিছু সৃষ্টি করছেন, তিনিও শিল্পী। শিল্পী তার সৃজনশীল মনের সন্তুষ্টি দান ও মানসিক যোগাযোগের কৌশলের মাধ্যমে যা প্রকাশ করে তাই শিল্প। তাহলে বলা যেতে পারে, শিল্পীমনের স্পর্শ মানুষের হৃদয়ে ভালো লাগার সৃষ্টি করছে শিল্পের মাধ্যমে।
মানুষ মাত্রই অনুকরণপ্রিয়। সাধারণ দৃশ্যমান যে জগৎ থেকে মানুষ অভিজ্ঞতা লাভ করে তাকে প্রকৃতি বলা হয়। যেমন গাছপালা, ফুল, ফল, পাখি, পাহাড়, পর্বত, মেঘ, বৃষ্টি, সমুদ্র ইত্যাদি। এই প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে মানুষের মন বিমুগ্ধ, বিস্মিত ও বিমূঢ় হয়ে যায়। তখন সে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে নিজের মধ্যে আপন করে পেতে চায়। এরই ধারাবাহিকতায় সে চায় এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে একটি স্বাভাবিক বা বস্তুগত রূপ দিতে। আর এর মাধ্যমেই জন্ম হয় শিল্পের। অর্থাৎ, চিরায়ত ও চিরন্তর নৈসর্গিক প্রকৃতিকে যখন শিল্পী নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত রঙ, রেখা, আকার, শব্দ বা রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করে সেই অনুভূতি অন্যের মনে সঞ্চার করে একটি পরিচয়বোধের সৃষ্টি করেন, তখন তাকেই শিল্প বা Art হিসেবে অভিহিত করা হয়। অন্যকথায়, দৃশ্যমান বা অদৃশ্য কোনো বিষয়বস্তুকে শিল্পী তার আপন চিত্তরসে রসায়িত করে যে স্থিতিশীল রূপ মহিমা দান করে, তাই শিল্প। যেকোনো সুন্দর, সহজ ও সরল জিনিসই শিল্প। কোনো কাজ সুন্দর ও সার্থকভাবে সম্পূর্ণ করাকেও শিল্প বা Art বলে। মানুষের কাজকর্মের মধ্যে যে বিশিষ্ট রূপভঙ্গি ইন্দি্রয় কে আমোদিত ও আনন্দিত করে, তাই শিল্প। অর্থাৎ, মানুষের কার্যকলাপের মধ্যে যে সুন্দর ও আকর্ষণীয় কোনো বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় এবং যা অন্যদের হৃদয় ছুঁযে় যায় তাকেই শিল্প হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই হৃদয় ছুঁযে় যাওয়া বৈশিষ্ট্যই মূলত শিল্প। যেমন কেউ সুন্দর করে কথা বলে, কেউ চমৎকার নাচে, কেউ সুন্দর ছবি আঁকে, কেউ অপূর্ব টেরাকোটা তৈরি করে ইত্যাদি। অর্থাৎ, কথা বলা, নাচ, ছবি, টেরাকোটা ইত্যাদি অন্য মানুষদের কাছে সুন্দর লেগেছে, তাই এগুলো শিল্প বা Art । মোট কথা, দৈনন্দিন কথাবার্তা বা আলাপ—আলোচনা এবং কাজের ভেতর মানুষ যা প্রকাশ করে থাকে, তা প্রকাশের ভঙ্গি ও তার সৌন্দর্যই হলো শিল্প।
ধরন অনুযায়ী শিল্পকে প্রধান দুভাগে ভাগ করা হয়। একটি চারুশিল্প ও অপরটি কারুশিল্প। যে শিল্প মূলত মানব মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে সৌন্দর্য সে সিক্ত করে মনে বিপুল আনন্দ সঞ্চার করে, তাকে চারুশিল্প বলে। অন্যদিকে, যে শিল্প মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রযে়াজন মেটানোর তাগিদ (বস্তুগত) থেকে উদ্ভূত এবং যা সৌন্দর্য ও উপভোগেরও সামগ্রী, তাকে কারুশিল্প বলে। হস্তশিল্প কারুশিল্পের অন্তর্গত একটি বিষয়। সাধারণ অর্থে হস্তশিল্প বলতে বোঝায়, হাত বা হস্ত দিযে় যে শিল্প তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে চিত্রকলা ও মৃৎশিল্প। চিত্রশিল্পী রঙ—তুলির সাহায্যে হাত দিযে়ই ছবি আঁকেন, অর্থাৎ হাত এখানে শিল্প তৈরির প্রধান হাতিয়ার। অথচ চিত্রকলাকে হস্তশিল্পের ভেতরে গণ্য করা হয় না। কারণ চিত্রকলা সুন্দর, উপভোগ্য ও মানুষের মনে আনন্দ দান করলেও বস্তুগত কোনো কাজে আসে না। ফলে তা কারুশিল্প তথা হস্তশিল্পের শর্ত পূরণ করে না। তাই চিত্রকলা হাত দিযে় তৈরি হলেও তা হস্তশিল্প নয়। অন্যদিকে মৃৎশিল্প শিল্পী হাত দিযে় তৈরি করেন, দেখতে সুন্দর, উপভোগ্য এবং একই সঙ্গে বস্তুগত কাজে লাগে, তাই মৃৎশিল্প হস্তশিল্প।
শিল্পের আরো দুটি ধারা হলো কারুশিল্প ও কুটিরশিল্প। শিল্পী তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মেধা—দক্ষতার ওপরে ভিত্তি করে দেশীয় উপকরণ ও কাঁচামাল ব্যবহার করে অত্যন্ত সহজ যন্ত্রপাতি দিযে় যেসব শিল্পকর্ম তৈরি করে থাকে, তাকে কারুশিল্প বলে। কারুশিল্প শিল্পীসমাজের সাধারণ ঘরে তৈরি। নির্মিত সামগ্রী বা শিল্পকর্মের গুণগত মান একই থাকলেও স্থানভেদে ডিজাইন ও মোটিফের আংশিক হলেও পরিবর্তন ঘটে। যেমন নকশী কাঁথা, মাটির পুতুল ইত্যাদি। কারুশিল্প দেশজ গঠনশৈলী, নকশার মোটিফ, তৈরির কৌশল ও রঙ করার পদ্ধতি মোটামুটি একই রকম থাকে, এখানে বিদেশী শৈলী অনুসরণ অনুসরণ করা হয় না। তাই সাধাসিধে ভাব লক্ষ্য করা যায়। এসব শিল্প কলকারখানায় তৈরি না হযে় শিল্পীদের নিজস্ব বাডি়তে বাডি়তে তৈরি হয়। তাতে অংশ নেয় পরিবারের অন্যরাও। অন্যদিকে, কুটিরশিল্প বলতে বোঝায় ব্যক্তি মালিকানাধীন, পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অথবা কিছু ভাড়া করা শ্রমিকের সহযোগিতায় স্বল্প মূলধনে স্থানীয় কাঁচামাল ও উপকরণ দিযে় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যেখানে সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করা হয় তাকে কুটিরশিল্প বলে। কুটিরশিল্প বলতে কুটিরে বা বাডি়তে উৎপাদন কার্যক্রম চলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এখানে পরিবারের সদস্য অথবা শ্রমিকদের সমন্বযে় মাত্র কযে়ক ঘণ্টা অথবা খণ্ডকালীন কাজ চলে থাকে। এই কাজ আবার অনেক সময় মৌসুমভিত্তিক হযে় থাকতে পারে। যেমন শীতলপাটি, মৃৎশিল্প, মোমশিল্প, ধাতবশিল্প ইত্যাদি।
কারুশিল্প, কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্প— এই তিন ধারাতেই দেখা যাচ্ছে কোনো—না—কোনোভাবে হাতের ব্যবহার হচ্ছেই। আবার কাঁচামাল ও উপকরণের ক্ষেত্রেও রযে়ছে ব্যাপক মিল। তাই বলা যায়, এই তিন মাধ্যমই একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রযে়াগ, তৈরি, কাঁচামাল ও ব্যবহারিক দিক দিযে়ও তেমন আলাদা নয়।
বাংলাদেশের হস্তশিল্পের এক বিরাট ঐতিহ্য রযে়ছে। সুদূর অতীত থেকেই ব্যবহারের জন্য, শোভাবর্ধনের জন্য এবং বিভিন্ন আচার—অনুষ্ঠানের জন্য হস্তশিল্পজাত সামগ্রী প্রস্তুত করা হতো। অধিকাংশ লোকজ নকশায় উপস্থাপিত হতো দৈনন্দিন জীবন অথবা প্রতীক। হস্তশিল্প হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল বয়ন, ধাতব পদার্থের কাজ, অলঙ্কার, বিশেষ করে রূপার তৈরি অলঙ্কার, কাঠের কাজ, বেত এবং বাঁশের কাজ ও মৃৎপাত্র। পরবর্তী সমযে় হস্তশিল্প পণ্য তৈরিতে পাট ও চামড়া প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
বাংলাদেশের হস্তশিল্পে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সৌন্দর্য ও নৈপুণ্য বিদ্যমান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, গাঙ্গেয় অববাহিকার মসলিন কাপড় রোমান এবং গ্রীক সার্মাজ্য পর্যন্ত পৌঁছে গিযে়ছিল। চীনা এবং আরব পর্যটকরাও বঙ্গদেশে উৎপাদিত উচ্চমানের সুতি এবং রেশমী কাপডে়র কথা জানতেন। ষোড়শ শতাব্দী থেকে বঙ্গদেশের উচ্চমানের হাতে বোনা বস্ত্র, উন্নতমানের গজদন্ত, রূপা ও অন্যান্য ধাতুর তৈরি হস্তশিল্পপণ্য মোগল দরবারেও সমাদৃত হযে়ছিল।