
অতিশয় এক মফস্বল গ্রাম-মূলবাড়ী। এ গ্রামে বড় একটা ঘটনা ঘটেছিলো ১৯৭১ সালে। গ্রামে ছিলো একটি বাজার। বাজারে ছিলো একটা বড়-বটগাছ; বটগাছের নিচেই ছিল ছোট ছোট কয়েকটা দোকান। একদিন বিকেল বেলা ছোট রাজু বাবার সাথে বাজারে এলো। সেখানে অনেকগুলো মানুষ জটলা হয়ে রেডিওতে খবর শুনছে। রাজুকে নিয়ে তার বাবা দোকানের এক কোণে বসে খবর শুনতে লাগলো। খবর শুনে অনেকেই হৈ চৈ শুরু করলো, এভাবে পাকিস্তানীদের নির্যাতন আমরা আর মানবো না। কেউ কেউ যুদ্ধে যাবার কথা বললো। রাজুর মনে পড়লো, গ্রামের মোড়ের রাস্তায় এক বয়স্ক লোক বায়োস্কোপ দেখাচ্ছে। সে বায়োস্কোপে নাকি বঞ্চনা, অত্যাচারের, মুক্তির ছবি দেখায়। রাজু এক দৌড়ে সেখানে গেলো। দেখলো অনেক লোক ভীড় করে বায়োস্কোপ দেখছে। রাজু অপেক্ষা করতে লাগলো বায়োস্কোপ দেখার জন্য। অনেকে বায়োস্কোপে চোখ লাগিয়ে দেখছে, আর বায়োস্কোপ-ওয়ালা খঞ্জন বাজিয়ে তালে তালে বলে যাচ্ছে- এই বারেতে দ্যাখা গেলো “১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি মুখের ভাষা কেড়ে নিতে আমাদের বুকে কী করে চালিয়ে ছিলো গুলি ওরা। তার পরেতে দ্যাখো ভাল, বহুবার স্বায়ত্তশাসন দাবি করেও দেয়নি ওরা আমাদের অধিকার। তার পরেতে আরও দ্যাখো, পরাধীন রেখে শাসনের নামে কীভাবে করেছে শোষণ ওরা আমাদের। এর পরেতে দ্যাখো ভালো, মুজিব অধিকারের কথা বলেছে যতো, ওরা নিরীহ জনতার উপর চালিয়েছে গুলি ততো। তার পরেতে আরও দ্যাখো, তবু বাঙালীরা এক হলো-অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ গড়তে ঝাঁপিয়ে পড়লো-স্বাধীন বাংলাদেশ যে গড়বেই।”……হঠাৎ মকবুল চেয়ারম্যান চারজন সহযোগী চামচা নিয়ে উপস্থিত হলো। সবাই ভয় পেয়ে গেলো, কারণ চেয়ারম্যান ছিলো রাজাকার। চেয়ারম্যান চামচাদের বললো, ওকে ধরে নিয়ে চল, একে শায়েস্তা করতে হবে। চামচা বায়োস্কোপ-ওয়ালাকে ধরে ফেললো। তারপর টেনে হিঁচড়ে চেয়ারম্যানের বাড়িতে নিয়ে গেলো। রাতে চেয়ারম্যানের উঠানে বৈঠক বসলো, চেয়ারম্যান সবাইকে জানিয়ে দিলো আগামীকাল দুপুরে পাকিস্তানী সেনারা আসলে বায়োস্কোপ-ওয়ালার বিচার হবে। রাজু মনে মনে খুব কষ্ট পেলো। বাড়িতে ফিরে ভাবতে লাগলো কি করে বায়োস্কোপওয়ালাকে বাঁচানো যায়। এক সময় রাজুর মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। এখনতো গ্রীষ্মকাল, প্রচ- গরমের দিন। আগামীকাল যখন বিচার শুরু হবে, তখন শরবতওয়ালা সেজে উপস্থিত হবে সে। তারপর সুযোগ বুঝে শরবতে বিষ মিশিয়ে ওদের খাওয়াবে। রাজু ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো।
সকালের দিকে চারদিকে হৈ-চৈ শুরু হলো। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা গ্রামে ঢুকে পড়েছে। ঢুকার মুখেই কয়েকটি বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। কয়েক জনকে নির্বিকারে গুলি করে মেরেছে। চারদিকে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাজু শরবত তৈরির উপকরণ সমূহ প্রস্তুত করে নিলো। মধ্যদুপুরে চেয়ারম্যানের উঠানের আম গাছতলায় বিচার শুরু হলো। বায়োস্কোপওয়ালাকে আগে থেকেই আম গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। মানুষের উপস্থিতি খুব বেশি নেই। ভয়ে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। রাজু শরবত বিক্রির উদ্দেশ্যে সেখানে উপস্থিত হলো। পাকিস্তানী সেনারা সতর্কতার সাথে অবস্থান করছে। অফিসার চেয়ারে বসা, সামনে টেবিল। সৈনিকরা চারদিকে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন চারদিকের পরিবেশ তাদের নজরে থাকে। পাকিস্তানী সেনাদের সাথে আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের চামচারাও ব্যস্ত। তারা এদিক সেদিক দৌড়ঝাঁপ করছে নানা কাজে।
‘শরবত খাবেন, শরবত…….’ হাঁক দিতে দিতে রাজু চেয়ারম্যানের আমতলায় দাঁড়ালো। চেয়ারম্যান তার চামচাদের একজনকে ডেকে বললো, এমন গরমের দুপুরে শরবত পেলে সেনা সাহেবরা খুশি হবেন। শরবতওলা ছেলেটারে এখানে নিয়ে এসে শরবত তৈরির ব্যবস্থা কর। এদিকে রাজু সেটাই চাইছিলো। রাজু পাক সেনাদের কাছের একটা টেবিলে শরবত তৈরী করতে লাগলো। পাক সেনা এবং চেয়ারম্যান উর্দুতে কি যেন শলাপরামর্শ করে সবাইকে জানিয়ে দিলো, বায়োস্কোপ দেখানোর অপরাধে এই বায়োস্কোপওয়ালাকে এখন গুলি করে হত্যা করা হবে। চেয়ারম্যান চামচাদের নির্দেশ দিলো বায়োস্কোপওয়ালাকে সামনে এনে দাঁড় করাতে। রাজু শুকনা গলায় চেয়ারম্যানকে বললো, স্যার, শরবত তৈরি হয়েছে, এখন খেতে পারেন। চেয়ারম্যান সবাইকে শরবত দিতে বললো। রাজু সবার হাতে হতে শরবতের গ্লাস পৌঁছে দিতে লাগলো। এক পাকসেনা চেয়ারম্যানের কানে কানে কি যেনো বললো। চেয়ারম্যান তা শুনে রাজুকে জিজ্ঞেস করলো- কিরে শরবতে কিছু মিশাইছিস নাকি? শরবতের রং এমন নীল কেনো? রাজু বুুঝতে পারলো বিষের পরিমাণ একটু বেশিই মেশানো হয়েছে। সে জন্য রং নীল দেখাচ্ছে। তবু রাজু উঁচু গলায় বললো, কি বলেন স্যার-আমি শরবতে কি মিশাইতে যাবো ছোট মানুষ হয়ে! চেয়ারম্যান বললো, তা বটে। কিন্তু পাক অফিসার রাজুকে বললো, তোর তৈরী করা শরবত তোকেই প্রথমে খেতে হবে, তারপরে আমরা খাবো। রাজু আঁতকে উঠলো, কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো আমি এ শরবত খেলে ওরাও খাবে। তাতে হয়তো আমি মারা যাবো, কিন্তু ওরাও তো মারা যাবে। তাই রাজু ঢক-ঢক করে এক গ্লাস শরবত খেয়ে নিলো। রাজুর শরবত খাওয়া দেখে চেয়ারম্যান বললো, এ বাচ্চা ছেলে কি আর করতে পারবে স্যার। সবাই আশ্বস্ত হলো। হাতে থাকা গ্লাসের শরবত খেয়ে নিলো সবাই।
এবার বায়োস্কোপ-ওয়ালাকে গুলি করে হত্যা করার পালা। তাই সামনের লোকজনকে সরিয়ে দিতে লাগলো চামচারা। এরমধ্য রাজু মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। অন্য সকলেরও গলা জ্বলতে শুরু করলো। পাক অফিসার রাজুর গলার ওপরে পা তুলে দিয়ে লেলিয়ে-লেলিয়ে বললো, হারামজাদা তুই আমাদের বিষ খাওয়াইলি। তোকেই আগে গুলি করে মারবো। রাজু গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘মার আমাকে’। কিন্তু শকুনের দল তোরাও তো মরবি। মনে রাখিস, আমাদের মত দেশ প্রেমিকরা শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও এ দেশকে স্বাধীন করে ছাড়বে। পাক অফিসার আরও তেতিয়ে গেল। রাজুর বুকে কয়েকটি গুলি করলো। রাজু শহীদ হলো। পাকসেনা, চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যানের চামচারাও একে একে লুটিয়ে পড়লো এবং বিষের জ্বালায় ছটপট করতে করতে সকলেই মারা পড়লো।