গল্পছোটদের গল্প
Trending

বুক-আকাশে সূর্য হাসে

মোহিত কামাল

নিজের শোবার ঘরে অপরিচ্ছন্ন পড়ার টেবিল গুছিয়ে নিয়েছে আদনান। নানা রঙের জেল পেনভর্তি একটা পেনস্ট্যান্ডও টেবিলের এক কোণে সাজিয়ে চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর ঝুঁকে মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করেছে সে।
‘পড়ার সময় পড়া, খেলার সময় খেলা’―এ প্রবাদটা সব সময় মাথায় থাকার কারণে ঘরের দরজা বন্ধ করে আপন মনে ডুবে থেকে পড়তে থাকা আদনান হঠাৎ মাথা তুলে ভূত দেখার মতো করে চমকে উঠল। তার টেবিলের সামনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছেন বাবা।
‘ক’দিন ধরে লক্ষ করছি বায়োলজি বইয়ের দিকে নজর নেই তোমার। কেবল অঙ্ক বই নিয়ে বসে থাকো। কেন, বলো তো?’
বাবার প্রশ্ন শুনে অবাক হলো না আদনান। যে—কাজই সে করুক না কেন, বাবা কিছু না কিছু জিগ্যেস করবেনই। ব্যাপারটা জানা আছে তার। প্রশ্নের ভেতরে সুপ্ত থাকে একধরনের সূক্ষ্ম সমালোচনা। কঠিন চোখে তাকিয়ে নরম গলায় প্রশ্ন করেন তিনি। তাঁর চোখের ভাষায় থাকে অসন্তুষ্টি। বাবাকে খুশি করার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিল সে। এ মুহূর্তে খুশি করার জন্য বাধ্য ছেলের মতো বলল, ‘বড় হয়ে তোমার মতো ইনজিনিয়ার হতে চাই। তাই অঙ্কের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিতে চাই।’
‘আনন্দ খুঁজে নেবে, ভালো কথা। তবে এ ইচ্ছাটা ছেড়ে দাও। আমি ইনজিনিয়ার, তোমার মা ইনজিনিয়ার, তোমার বড় ভাইয়াও পড়ছে বুয়েটে। তবু তুমিও প্রকৌশলী হতে চাও? এ কেমন কথা, বাবা? আমি চাই, তুমি চিকিৎসক হবে। প্রফেসর ডা. এম আর খানের মতো জাতীয় অধ্যাপক হবে।’
‘আব্বু, কী বলছ তুমি? চিকিৎসাবিজ্ঞান আমার একদম ভালো লাগে না। বায়োলজি পড়ায় কোনো আগ্রহ পাই না। আমার ইচ্ছার কোনো মূল্যই দিতে চাচ্ছ না, তুমি?’
‘ইচ্ছা বদলাও। এখন থেকে চেষ্টা করলে বদলে যাবে, আমার ইচ্ছামতো চলতে পারলে চিকিৎসক হতে পারবে।
ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে বসে রইল আদনান। মনে মনে ফন্দি বের করল, বিতর্কে জড়াবে না বাপির সঙ্গে। বাপি যা বলবে, সব শুনবে মনোযোগ দিয়ে। কেবল কাজ করবে উল্টো।
ছেলেকে চুপ থাকতে দেখে খুশি হলেন আদনানের বাপি। ছেলের মাথায় আদরমাখা চাটি মেরে এগিয়ে গেলেন বসার ঘরে। টেলিভিশনের রিমোট হাতে নিয়ে বসে গেলেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল দেখার জন্য।
বাপিকে চলে যেতে দেখে খুশি হলো আদনান। খাতা টেনে একটা সাদা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে বড় বড় অক্ষরে সাইনপেন দিয়ে লিখল মুখস্থ করা পাঠ্যবইয়ের কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি :
বইয়ের পাতায় প্রদীপ জ্বলে
বইয়ের পাতা স্বপ্ন বলে
যে-বই জুড়ে সূর্য ওঠে
পাতায় পাতায় গোলাপ ফোটে
সে-বই তুমি পড়বে।

সাদা পাতায় কবিতাংশটি লিখে বাপির পড়ার টেবিলে রেখে চুপচাপ ফিরে এসে পড়তে বসল আদনান। বায়োলজি বইটা খুলে রাখলেও মন টানছে গণিত বই। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের জন্য ইদানীং গোপন একটা ইচ্ছা মনে নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে। দুরন্ত আগ্রহটা মনের পাতায় ফুটে ওঠার কারণ গণিতে রুমির সাফল্য। গতবারের বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা শেষে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল সে। পুরো সাফল্য না—পেলেও হাল ছাড়েনি রুমি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে নিজেদের স্কুলের মেধাবী ছাত্র ধনঞ্জয় বিশ্বাস বাংলাদেশের জন্য প্রথম ছিনিয়ে এনেছিল রৌপ্যপদক। এ সাফল্যের কারণে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে পুরো স্কলারশিপে পড়াশোনার আমন্ত্রণ পেয়েছিল ধনঞ্জয়। খবরটা জানা আছে আদনানের। রুমি ও ধনঞ্জয়ের সফলতা গোপনে আলোড়ন তুলেছে আদনানের মনেও। এ আকাক্সক্ষার কথা বাসার কাউকে বলেনি সে। গোপন বাসনা নিয়ে সবার চোখের আড়ালে তাই চর্চা করে চলেছে গণিত। মাঝে মাঝে ও রুমিদের বাসায় যায়। একসঙ্গে দু’বন্ধু সমাধান করে অঙ্কের জটিল জটিল গিঁট। গণিতকে আর কঠিন মনে হয় না। সহজ মনে হয়, আনন্দ পায় গণিত বই হাতে নিলে। এখনও তুমুল আনন্দে চকচক করে উঠল চোখ।
বইয়ের প্রথম পাতা উল্টে তাজ্জব বনে গেল আদনান। সাদা হয়ে গেছে বইয়ের পাতা। পাতার পর পাতায় কালির আঁচড়ে  লেখা কোনো শব্দ নেই। জটিল অঙ্করা পালিয়ে গেছে, সহজ অঙ্কগুলোও উধাও হয়ে গেছে। পরিবর্তে প্রথম পাতায় ফুটে আছে একটা লাল গোলাপ। কয়েকটা লাল পাপড়ির মাঝ বরাবর দুটি গোলাকার নীল পাপড়ি যেন দুটি নীল চোখ; তাকিয়ে আছে আদনানের দিকে। মনে মনে আদনান প্রশ্ন করল, ‘নীল চোখ! নীল চোখ! কোত্থেকে এলে তুমি আমার গণিত বইয়ে?’
‘তোমার মনের টানে উড়ে এলাম জাদুর দেশ থেকে!’
গোলাপের উত্তর শুনে চমকে উঠল আদনান। ভেবেছিল আপন মনে ভুল করে নিজেকে প্রশ্ন করছে। এখন কথা শুনছে ফুলের! একি জাদু! জাদুবলেই কি কথা ফুটল নীল পাপড়ির কাঁপন লাগা ঠোঁটে?’
‘জাদুর দেশটা কোথায়? আমার বইয়ের অঙ্কগুলো কি মুছে দিয়েছ জাদুর ছোঁয়ায়?’
‘না। যেমনটি থাকার কথা, তেমনই আছে তোমার বই।’
‘ও! আমি তো কোনো বর্ণ কিংবা লেখা দেখতে পাচ্ছি না। দেখছি শুধু সাদা পাতা।’
‘আমি চলে গেলে সাদা কাগজ আবার ভরে যাবে কালো বর্ণের অঁাচড়ে। তখন তোমার প্রিয় গণিত বইয়ের পুরো ছবি ভেসে উঠবে আগের মতো।’
‘না, তুমি যেয়ো না। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে।’
‘অযৌক্তিক ভালো লাগায় ডুবে থাকলে চলবে, আদনান? তুমি ছাত্র। পড়ালেখাই একজন ছাত্রের সবচেয়ে বড় কাজ। সেই কাজে অবহেলা করলে চলবে?’
‘ও! আমার নামও জানো তাহলে! বড়দের মতো কেবল পড়াশোনার উপদেশই দিচ্ছ?’
‘না। কেবল পড়াশোনার কথা বলছি না। গণিত অলিম্পিয়াডেও অংশ নেবে তুমি। সেটা আমিও চাই।’
‘আমার মনের কথা বলেছ, তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।’
‘হ্যাঁ, একদিন তুমি অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজে পড়বে। স্কলারশিপে পড়াশোনার ডাক পাবে সেখানে।’
‘এত বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছ! স্বপ্ন দেখিয়ো না। বাস্তবেই যেতে চাই আমি।’
‘অবশ্যই যেতে পারবে সেখানে। অবশ্যই তোমার ইচ্ছা পূরণ হবে।’
‘কীভাবে বুঝলে?’
‘ক্যামব্রিজ কিংবা অক্সফোর্ডে পড়ার জন্য যে—আকাক্সক্ষা থাকার কথা, সেটা তোমার আছে। তোমার চোখ থেকেও ফুটে বেরোচ্ছে দুরন্ত আলোর শিখা।’
নীল পাপড়ির বিশ্বাসী উচ্চারণ শুনে চমকে উঠল আদনান। একবার চোখ বন্ধ করে আবার খুলে হতবাক হয়ে গেল। লাল গোলাপ আর নীল পাপড়ি—চোখ উধাও হয়ে গেছে। বইয়ের পাতায় সাজানো রয়েছে গণিতের সমাধান। আর দেখল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির শীর্ষ স্বপ্নচূড়ায় উড়ছে লাল—সবুজ পতাকা। এ কোন জাদু? কাকে জিগ্যেস করবে, ভেবে পেল না আদনান। কেউ এ কথা বিশ্বাস করবে না। আব্বু তো নয়ই।
মনে মনে ভাবছিল, বাপিকেই সব কথা খুলে বলবে। কেন গণিতে বেশি সময় দিচ্ছে, সে—কথাও জানাবে। অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজে পড়ার কথা শুনে নরম হয়ে যেতে পারে তাঁর মন। চিকিৎসক হওয়ার জন্য আর চাপও তখন দেবেন না নিশ্চয়ই।
ভাবনা থেমে গেল। খোলা চোখে আদনান দেখল বাপি ঢুকছেন ওর ঘরে। তাঁর হাতে ধরা টেবিলে রেখে আসা কবিতাংশ লেখা সেই সাদা কাগজটি। ছেলের সামনে এসে নরম গলায় বললেন, ‘তোমাকে অভিনন্দন জানাতে এলাম।’
বাপির দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে রইল আদনান। কী ঘটল, বাপি কেন অভিনন্দন জানাতে এসেছেন, বুঝতে না—পেরে অনুমান করে বলল, ‘ওই কাগজে লেখা কবিতাংশটা আমার লেখা নয়। ওটি পাঠ্যবইয়ের কবিতা, মুখস্থ লিখে রেখে এসেছি তোমার টেবিলে। ওই কবিতার জন্য আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছ কেন?’
‘কোথায় কবিতা লিখেছ?’
‘কেন, ওই সাদা কাগজে।’
‘হ্যাঁ। ওই কাগজে অঁাকা প্রদীপটা সুন্দর হয়েছে। সূর্যের আলো মলিন হয়ে গেছে প্রদীপের আলোয়। মেঘে ঢাকা কেন রোদ? এই রঙ ব্যবহারের অর্থ বুঝলাম না। তবে গোলাপ ফুলটা অসাধারণ। নীল পাপড়ি যেন নীল চোখ। গোলাপের নীল চোখ থাকতে পারে, মাথায় এল কীভাবে? আই ফিল প্রাউড অব ইউ, মাই সান। আমি তোমাকে নিয়ে গৌরব বোধ করছি। আঁকা ছবির মাধ্যমে যা ফুটে উঠেছে, তাকে ছবির কবিতাই বলা যায়।’
‘কিন্তু আব্বু, আমি তো প্রদীপ আঁকিনি, সূর্য কিংবা গোলাপ আঁকিনি। মুখস্থ কবিতাই কেবল লিখে রেখে এসেছি তোমার টেবিলে।’
আদনানের ব্যাখ্যার মর্ম ঢুকল না ওর বাপির কানে। আপন মনে বলেই যাচ্ছেন, ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসটিও সুন্দর হয়েছে। অসাধারণ, মাই সান! তোমার ইচ্ছার কাছে নত হলাম আমি। আর কখনও চিকিৎসক হতে বলব না তোমাকে। এখন চাই ইনজিনিয়ারই হও তুমি। মন বদলে গেছে আমার। নতুন করে চাই অক্সফোর্ডে পড়বে তুমি।’
‘কিন্তু বাপি…।’
‘কোনো কিন্তু নয়। আমার ছেলে ক্যামব্রিজে পড়বে―এই আশায় কোনো ফাঁক রাখতে চাই না। নাও, তোমার অঁাকা ছবি তোমাকেই উপহার দিলাম।’ কথা শেষ করে ছেলের ঘর ছেড়ে চলে গেলেন বাপি।
কাগজে চোখ বুলিয়ে মাথা ঘুরে গেল আদনানের। কাগজের মাঝখানে ফুটে আছে লাল গোলাপের নীল চোখ। চোখ থেকে ঝরে পড়ছে ঝকঝকে আনন্দ—রোদ। সেই আনন্দ—আলোই কি বদলে দিয়েছে বাপির মন! পুরোটাই কি জাদুর খেলা! কে ছোঁয়াচ্ছে জাদুর কাঠি?
আদনানের মনের ভাব টের পেয়ে সাদা কাগজে আঁকা লাল গোলাপের নীল চোখ বলল, ‘কেউ না। কেউ জাদুর কাঠি ছোঁয়াচ্ছে না।’
নীল চোখের কথা শুনে আবারও মুগ্ধ হয়ে আদনান প্রশ্ন করল, ‘তাহলে এত সব কাণ্ডকীর্তি ঘটছে কীভাবে?’
‘তোমার ইচ্ছাশক্তির বলেই ঘটে চলেছে সব। এই শক্তি টেনে নিয়ে যাবে তোমাকে আলোর পথে, তোমার স্বপ্নের দেশে…।’
নিজের ইচ্ছাশক্তির কথা জানা নেই আদনানের। অথচ জানে নীল চোখ। ওর কথা শুনে সাদা কাগজটার দিকে তাকিয়ে আচমকা আবার কেঁপে উঠল আদনান। সে দেখল, সাদা কাগজ থেকে উধাও হয়ে গেছে সব চিত্রকর্মে অঁাকা নীল চোখ। পরিবর্তে সেখানে লেখা রয়েছে আদনানেরই হাতে লেখা পাঠ্যবইয়ের কবিতাংশটি ।

২.
বায়োলজি বই খুলে বসামাত্রই ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। তার মানে জেনারেটরও বন্ধ হয়ে গেছে। বিকেল থেকে এ এলাকার বিদ্যুৎ—সংযোগ বিচ্ছিন্ন। চলছে লোডশেডিং। এতক্ষণ তাই গুড়গুড় করে চলেছে জেনারেটর।
রাস্তার পাশে বড় শিশুগাছটার ডালের সংযোগস্থলে তৈরি হয়েছিল বড় একটা কোটর। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যেত ওই কোটরে বা গর্তে। সবার অগোচরে ধীরে ধীরে পচন ধরছিল ডালে। আজ বিকেলে রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা ডালটা আচমকা কড়কড় শব্দ তুলে ভেঙে পড়েছে। ছিঁড়ে গেছে গাছের তল দিয়ে জঞ্জালের মতো গড়ে ওঠা টিঅ্যান্ডটির তার—ঘেঁষা কেবল্ লাইন। ইলেকট্রিসিটির পিলারটাও হেলে পড়েছে। ছিঁড়ে গেছে বিদ্যুতের তারও। তবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। ব্যস্ততম সড়কে ওই মুহূর্তে যান কিংবা মানবজট ছিল না। ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। দ্রুত এই এলাকার বিদ্যুৎ—সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কখন লাইন ঠিক হবে জানা নেই। টানা দু’ঘণ্টা চলার পর এক ঘণ্টা বিশ্রামে থাকবে বাড়ির অটো জেনারেটর। এখন জেনারেটরও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘরের মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার জেগে উঠল। ঘন অন্ধকারের আলাদা একটা রূপ আছে। অনুভবে নাড়া দিল সেই সৌন্দর্য। চোখ বন্ধ করে চারপাশের ঝিঁঝিঁ—ডাকা অন্ধকারের রূপে মুগ্ধ হয়ে গেল আদনান। সেই অন্ধকার ফুঁড়ে চোখ থেকে বেরোতে লাগল চাঁদের গাঢ় সাদা রুপোলি আলো। সেই আলোয় আদনান স্পষ্ট দেখল, বায়োলজি বইয়ের পাতার মধ্যে ফুটে আছে কবিতার নতুন ফুল :

থাকব নাক বদ্ধ ঘরে
দেখব এবার জগৎটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ
যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।

চারটি পাপড়িতে লেখা চারটি চরণ। একত্রে মিলেমিশে শব্দধ্বনি তুলছে এ চার পাপড়িদল। সেই ধ্বনি উদ্বেল করে তুলছে আদনানকে। বদ্ধ ঘরের অঁাধার ফুঁড়ে উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে চাঁদের দেশে। কৌতূহলের ঘূর্ণি উঠছে, অদম্য সাহসের পাখা গজিয়ে গেল দেহে। কল্পনার পাখায় উড়ে উড়ে যেতে চাইল গাছে বাঁধা একাজোড়া ইষ্টিকুটুম পাখির বাসায়। ইষ্টিকুটুম পাখির আরেক নাম বেনেবউ। বেনেবউ জুটি নিরাপদ আছে তো? গাছের ডাল ভেঙে গেছে। দড়াম করে মনে প্রশ্ন চাড়া দিয়ে উঠল, পাখির বাসাও কি তাহলে ভেঙে গেছে?
প্রতিদিন মধুর সুরে গান গাইত ওরা। একলা ঘরে একলা পাখির মতো মনোযোগ দিয়ে গান শুনত আদনান। ডাল ভাঙার পর আর গান শোনেনি। তবে কি অন্য কোথাও চলে গেছে ইষ্টিকুটুম বেনেবউ জুটি? ঘরহারা বেনেবউ কি তাহলে কষ্টে আছে? ঘরহীন অনেক মানুষ যেমন ফুটপাতে পলিথিনের বস্তিঘর তুলে বাস করে, খড়কুটো দিয়ে তেমন কোনো ঘর বানাতে পারবে তো বেনেবউ জুটি? নাকি যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে চুরমার হয়ে যাবে তাদের হলদে ডানা?
অজানা চিন্তার জট খুলে যেতে লাগল। ভাবনার মুহূর্তেই শুনতে পেল বেনেবউয়ের করুণ ডাক। তার ঘরের জানালার গ্রিলে বসে করুণ সুরে ডাকছে একাকী সে। একা কেন? ওর সঙ্গী পাখিটা গেল কোথায়? এমন বিলাপের ধ্বনি কেন বেরোচ্ছে একাকী পাখিটার কণ্ঠ থেকে? আদনানের ভাবনার ঘোরে মিশে গেল কষ্টের ঘূর্ণি। কষ্ট নিয়ে আবার তাকাল এরই মধ্যে খুলে রাখা বইয়ের পাতার দিকে।
একি! আলো নেই! অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে কবিতার পাপড়িদল!
অবাক হয়ে আদনান আরও দেখল অন্ধকার আবারও চেপে ধরেছে চারপাশ। মনে নতুন ভাবনা উদয় হলো : একলা হওয়া সেই বেনেবউ পাখিটার জন্য কিছু করতে হবে। করা উচিত তার। মন্দ চিন্তা দূরে ঠেলে, স্বার্থপরতা ছুড়ে ফেলে দিয়ে শুভ ভাবনার দীপ জ্বালাল বুকে। ঈর্ষা ও হিংসার চিহ্নটুকু পুড়িয়ে ফেলে চোখে জ্বালাল নতুন আলো। নিজেকে আলোকিত করে অন্ধকারেও আবার আলোর দেখা পেয়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আশ্চর্য, উড়ে যাচ্ছে না বেনেবউ। ওর উপস্থিতি টের পেয়ে একবার মাত্র ডানা ঝাপটাল। তার পর গ্রিলে বসে আবারও ডাকতে লাগল করুণ সুরে।
বেনেবউ কি ওর সঙ্গীটিকে হারিয়ে ফেলেছে? ডাল ভেঙে পড়ার সময় কি কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে? আদনানের বুকের ভেতর প্রশ্ন দুটো দুঃসংবাদের খবর নিয়ে তেড়ে উঠল। ভালো করে তাকিয়ে শুনতে লাগল পাখিটার করুণ বিলাপ।
পাখিটা কি তাহলে কাঁদছে! আরও কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করল আদনান।
তাই তো! বেনেবউয়ের চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে!
এ লাল তো স্বাভাবিক নয়, দেহের কোথাও ক্ষত হলে রক্ত যেমন দেখায়, তেমন টকটকে লাল! চোখের কোণে লালের সঙ্গে মিলেছে কালো। প্রাণী জবাই করার কিছুক্ষণ পর রক্ত যেমন লালচে—কালো রং ধারণ করে, তেমন হয়ে আছে চোখের কোণটা। করুণ দৃষ্টিতে এবার বেনেবউটা তাকাল আদনানের চোখের দিকে।
বেনেবউয়ের চোখ আদনানের চোখকে বলছে, ‘আমার খুব বিপদ। বিপদে আমার পাশে দাঁড়াবে না?’
‘অবশ্যই দাঁড়াব। কী বিপদ তোমার, বন্ধু?’
‘তোমাদের বাসার সামনের গাছের ডাল ভেঙে পড়ার সময় আমার প্রাণবন্ধু কিশোর পাখিটা আঘাত পেয়েছে। তার একটা ডানা ভেঙে গেছে। রাস্তার পাশে ড্রেনের মধ্যে পড়ে আছে সে। ব্যথায় কাতরাচ্ছে। তার বুঝি আর বাঁচার উপায় নেই।’ কথাটা শেষ করে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল পাখিটা।
পাখির দুখী কণ্ঠস্বর ছুঁয়ে গেল আদনানের প্রাণ। সে বলল, ‘আমাকে নিয়ে চলো তার কাছে। দেখি, তোমার বন্ধুকে বাঁচানো যায় কি না!’
বেনেবউয়ের চোখে এবার খুশির চকচকে আলো। ঝিলিক দিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে গেল সেই আলো। বদ্ধঘরের লোডশেডিংয়ের অন্ধকার ফুঁড়েও বয়ে গেল সেই আলোর তরঙ্গ। আদনানের বুকের ঘরে কাঁপন উঠল। বিস্ময় নিয়ে লক্ষ করল কবিতার পাপড়ি ফুটছে তার বুকে। আপন মনে গেয়ে উঠল :
থাকব নাকো আঁধার ঘরে
বাঁচাব এবার সখীর সখাকে…
নিজেই অবাক হলো আদনান। অন্ধকারে কেবল কবিতার ফুলই ফোটেনি, মনেও ঘটে গেছে বিপ্লব।
‘তোমার মনের খবর পেয়ে গেছি। তোমার হৃদয়ে জেগে ওঠা কবিতার চরণ ছুঁয়ে দিয়েছে আমার মন। বিপদে পাশে যে থাকে, সে—ই তো আসল বন্ধু। তোমার বন্ধুত্ব বরণ করে নিলাম আমি,’ বলল বেনেবউ।
নতুন বন্ধুর সুন্দর কথা শুনে খুশি হয়ে আদনান বলল, ‘বেনেবউ, তুমি রওনা হও। আমাকে তোমার বিপদে পড়া বন্ধুকে দেখিয়ে দাও। আমি চেষ্টা করব আমার সাধ্যমতো। এখন ওকে উদ্ধার করাটাই বড় কাজ।’
আনন্দে উড়াল দিল বেনেবউ।
লোডশেডিংয়ের অন্ধকার তাড়িয়ে বদ্ধঘর থেকে বেরিয়ে গেল এক মানব-মশাল। ওই মশালের আলো চমকে দিল আদনানের মা’র মন। ভয়ে চিৎকার করে জিগ্যেস করলেন, ‘কে? কে বেরোল ঘর থেকে?’
‘আমি।’
‘আমিটা কে?’
‘বাহ্! আমার কণ্ঠস্বর চিনতে পারলে না?’
‘ও, আদনান?’
‘জি। আমি।’
‘অসময়ে কোথায় যাচ্ছ?’
‘অসময় নয় মামণি, সময়টা খুবই জরুরি। বিপদগ্রস্ত এক বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে হবে। উদ্ধার করতে হবে তাকে।’
‘তুমি উদ্ধার করবে? এত সাহস হয়েছে তোমার?’
‘তুমি কি মনে করো তোমার ছেলে একটা ভিতুর ডিম?’
‘না। ভিতু মনে করি না। তবে…,’ থেমে গেলেন আদনানের মামণি।
‘আমার হাতে সময় নেই। আমি যাচ্ছি, মামণি।’
ছেলের আচমকা পরিবর্তনে অবাক হলো মায়ের মন। বাধা দিতে চাইলেন, চিৎকার করে বললেন, ‘বাজে কাজে যেতে হবে না তোমাকে। বাইরে ঝোড়ো বাতাস বইছে। তুফান আসতে পারে।’
‘বাজে কাজ’ শব্দ দুটি যেন ওর মাথায় বোমা ফাটাল। একটা জেদ এসে নাড়া দিল ভেতরটাকে। ঝোড়ো বাতাস কিংবা তুফানের ভয় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বেনেবউয়ের উড়ে যাওয়া পথ ধরে মাথা উঁচিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল আদনান। বাইরে আসলেই বইছে প্রবল বাতাস। সামনে এগোতে পারছে না বেনেবউ। বাতাসের সেই ঝাপটা আটকে রেখেছে তার উড়ালপথ। প্রাণপণে ডানা ঝাপটাচ্ছে, কিছুতেই থামবে না, পিছু হটবে না সে। উড়ে যেতেই হবে তাকে তার সখার কাছে। নতুন মানববন্ধুকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতেই হবে। নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও বন্ধুর জীবন বাঁচানোর জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠল বেনেবউ।
বাইরে এসে আদনানও পেল বাধা। ঝোড়ো বাতাস যেন এগোতে দেবে না তাকে। কখনও প্রতিকূল আবহাওয়ায় বাইরে বেরোনোর সুযোগ পায়নি। আজই মাত্র বের হয়েছে। কীভাবে ভয়কে জয় করে এগোতে হয়, জানা ছিল না। আচমকা অচেনা কেউ সেই সাহসের জোগান দিল হৃদয়ের গভীর থেকে। ফলে তাকে আটকাতে পারল না কোনো ভয়, শঙ্কা, উৎকণ্ঠা। প্রবল আত্মবিশ্বাস আর সাহস নিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়।
ওই যে দেখা যাচ্ছে বেনেবউকে… ওই যে রাস্তার ধারে ড্রেনের কাছে পড়ে থাকা ডালের আড়ালে গিয়ে বসেছে সে।
নিজেকে অনেক দুঃসাহসী মনে হলো আদনানের। এত সাহস তো ছিল না আগে। মনে আসা সাহসে ভর করে সে বলে উঠল, ‘বাতাস, তুমি ভয় দেখিয়ো না আমাকে। ঠেকাতে পারবে না তুমি। পথ ছাড়ো। শান্ত হও।’
অদ্ভুত ব্যাপার! দেখতে দেখতে কমে গেল বাতাসের ঘূর্ণি।
বাতাস কি তবে শুনতে পেয়েছে আদনানের কথা! এ-ও কি সম্ভব?
সম্ভব—অসম্ভবের ব্যাপার নয়, আদনান বুঝল, অদম্য সাহসের সামনে পরাজিত হতে বাধ্য সব বাধা। সাহসই বড় শক্তি। সাহসই আদনানকে টেনে নিয়ে গেল দুর্ঘটনায় শিকার হওয়া বেনেবউয়ের বন্ধুর কাছে।
খুব যত্নে আহত পাখিটাকে হাতে তুলে নিয়ে আদনান দেখল, ওর একটা ডানা ভেঙে গেছে। রক্তে ভিজে জবজবে তার বুক। রক্ত এখন আর লাল নেই। কালো হয়ে জমাট বেঁধেছে। বেনেবউয়ের চোখের কোণে জমে থাকা লাল—কালো জমাট রক্তের মতোই একই রঙ এ—জমাট রক্তেরও।
তবে কি ‘বেদনা’ রক্তরঙ হয়ে ফুটে আছে বেনেবউয়ের চোখে?
আর্তনাদ করে উঠল আদনানের মন। বুঝল, স্বজনের বিপদে যেমন কেঁদে ওঠে মানুষের মন, তেমনি কাঁদে পাখির মনও। বুঝল, মানুষের মনের মতো পাখির মনেও তৈরি হয় টান। এ টানের উৎস একই; হৃদয়ের বন্ধন। বেনেবউয়ের হৃদয়ের রক্তঝরা বন্ধ হবে যদি ওর বন্ধুকে বাঁচানো যায়। ভেবে আকুল হয়ে বোঝার চেষ্টা করল, নিস্তেজ পাখিটা বেঁচে আছে তো? ভাবনায় দুলে উঠে একবার তাকাল বেনেবউয়ের চোখের দিকে। তার দুচোখে দেখল করুণ চাউনি। চোখ যেন বলছে, ‘আকাশের রুপোলি চাঁদটা এনে দেব তোমাকে, হিমালয়ের তুষারঝরা কোমলতা আর শীতল বাতাসে ভরে দেব তোমার বুক। আমার বন্ধুকে ভালো করে দাও।’
আদনানের মন ছুঁয়ে গেল বেনেবউয়ের মনের কথায়। চাঁদের আলোর মতো স্নিগ্ধ উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠল সে। উজ্জ্বলতার মধ্যেও কষ্ট টের পেল। ‘পাখিটা কি মরে গেছে?’ নিজের মনে জেগে ওঠা প্রশ্ন কাঁটার মতো বিঁধে গেল হৃৎপিণ্ডে।
আদনানের হাতটাকে আর হাত মনে হলো না বেনেবউয়ের; ভাবতে লাগল, গোলাকার রুপোলি আলোর তুলতুলে কোমল বেডে পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে তার বন্ধু। সে ভালো হয়ে যাবে, সেরে উঠবে শিগগির―এমন আশায় বুক বেঁধে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিচিরমিচির শব্দে প্রার্থনার সুরে বেনেবউ গাইতে লাগল গান। গানের শাব্দিক অর্থ বুঝতে না—পারলেও বোঝা গেল, এ গানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবজগতের হৃদয়—উজাড়—করা ভালোবাসার কথা।
আদনান সেই গানের টানে একদৌড়ে এগিয়ে গেল ওদের বাসার সামনের হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দিকে। তেমন ভিড় নেই আজ হাসপাতালে। ভেতরে ঢুকে টেবিলের অপর পাশে বসে থাকা কর্তব্যরত চিকিৎসকের উদ্দেশে আদনান বলল, ‘ওকে বাঁচান, প্লিজ!’
‘ওকে মানে, কাকে?’
‘এই যে, এই পাখিটাকে। গাছের ডাল ভেঙে আহত হয়েছে। রক্ত ঝরে গেছে শরীর থেকে। ওকে বাঁচান!’
হো হো করে হেসে উঠলেন চিকিৎসক। পাষাণ ডাক্তারের হাসিতে কেঁপে উঠল জরুরি বিভাগের চারপাশের দেয়াল। কেঁপে উঠল জানালার গ্রিলে বসে থাকা বেনেবউ। নিষ্ঠুর হাসি উপেক্ষা করে আদনান একবার তাকাল চিকিৎসকের মুখের দিকে। প্রচণ্ড রাগ হলো। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার তাকাল গ্রিলে বসে থাকা বেনেবউয়ের দিকে। অবাক কাণ্ড! জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে এবার আদনান দেখল, সুন্দর একটা সূর্য উঠেছে আকাশে। সন্ধ্যারাতে সূর্য উঠল কীভাবে! আগুনের তেজ নেই রোদে। আছে আশ্চর্য সুন্দর চাঁদের রুপোলি আলোর ঢেউ। সেই আলোর কোমল চাদরের তলে ডুবে আছে হাসপাতাল!
পলকহীন চোখে বেনেবউ তাকিয়ে আছে ওর হাতে ধরা প্রাণবন্ধুর দিকে। সে—চোখে চোখ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের কোমল সূর্যটা বুকের পাঁজর ভেঙে ঢুকে গেল তার নিজের বুকের ভেতরে। নতুন আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল সে। বুকে জাগছে নতুন একটা অনুভব—ধৈর্য আর মানবিক বোধে তীব্র একটা ঝাঁকুনি খেয়ে শান্ত গলায় আদনান পাখিটাকে দেখিয়ে চিকিৎসকের উদ্দেশে বলল, ‘হাসবেন না। ওটা একটা প্রাণী। ওর প্রাণ আছে, ওর হৃদয় আছে। হৃৎপিণ্ড আছে। শিরা-উপশিরায় ছুটে বেড়ানো লাল রক্ত আছে। রক্তে আছে মমতা, ভালোবাসা। আপনার হৃদয়েও যদি তা থাকে, তবে ওকে বাঁচান।’
টলে উঠলেন ডাক্তার। আদনানের শান্ত অথচ দৃঢ় কথার শক্তির দাপটে মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল তার বিদ্রুপমেশানো হাসি। আদনানের হাতে ধরা পাখিটার দিকে একবার তাকালেন তিনি। তার পর টর্চের আলো ফেলে পাখির চোখের মণি দেখে বললেন, ‘এখনও বেঁচে আছে ও।’
নতুন সূর্য জেগে উঠল আদনানের বুকের ভেতর। একই রকম সূর্য হাসতে দেখল সে বেনেবউয়ের চোখে। মনে মনে আদনান আবার গেয়ে উঠল :
যে-বই জুড়ে সূর্য ওঠে
পাতায় পাতায় গোলাপ ফোটে
সে-বই তুমি পড়বে।
প্রকৃতির সবকিছুকেই মনে হলো একেকটা গ্রন্থ। বেনেবউকে মনে হলো পাখিপুস্তক। কত কিছু জানার আছে, কত কিছু পড়ার আছে বইয়ে। ভাবতে ভাবতে সে আবার তাকাল হাতে ধরা পাখিটার দিকে। কৃতজ্ঞভরা চোখে পাখিটাও তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ভরসার আলো লাল গোলাপ হয়ে ফুটে উঠেছে ওই চোখে। বাঁচার আকুতিও ঝরে পড়ছে চোখ থেকে।
আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে আদনান চিকিৎসককে প্রশ্ন করল, ‘এখন কী করা উচিত, স্যার?’
‘ওকে রক্তশূন্য মনে হচ্ছে। রক্ত দিতে হবে ওকে।’
রক্ত দেওয়ার কথা শুনে ভয় পেয়ে আদনান তাকাল বেনেবউয়ের দিকে।
বেনেবউ চেঁচিয়ে বলল, ‘একটুও চিন্তা করো না। আমি রক্ত দেব। আমার শরীর থেকে রক্ত নিয়ে ওর রক্তের ঘাটতি মেটাও।’
বেনেবউয়ের কথা শুনে বুকের মধ্যে ঢুকে যাওয়া সূর্যটার নতুন অর্থ ধরতে পারল আদনান। বুকের ঘরে ছড়িয়ে যেতে লাগল মায়ার ঢেউ। মায়াবী কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘তোমার রক্ত শুষে নিলে বাঁচবে তুমি?’
‘আমার বাঁচার দরকার নেই। কেবল রক্ত নয়, প্রয়োজনে আমার হৃৎপিণ্ডটা খুলে বসিয়ে দাও ওর বুকে। তবু বাঁচাও ওকে।’
বেনেবউয়ের কথা শুনে থরথর করে কেঁপে উঠল আদনান। পাখির ভালোবাসা আর মমতার কাছে মানুষ হিসেবে নিজেকে মনে হলো খড়কুটো, পোড়া ছাই, তুচ্ছ প্রাণী।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শুনতে পাননি ওদের কথোপকথন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘পাখির জন্য লাগবে একই প্রজাতির অন্য একটা পাখির একই গ্রুপের রক্ত। কোত্থেকে জোগাড় করবে এই রক্ত?’
গ্রিলের দিকে আঙুল তুলে আদনান বলল, ‘ওই যে ওখানে বসে আছে ওই পাখিটার প্রাণবন্ধু। ও নিজের রক্ত এবং হৃৎপিণ্ড দিয়ে বাঁচাতে চায় তার বন্ধুকে।’
‘তুমি কীভাবে বুঝলে?’
‘বুঝতে পারি। কীভাবে বুঝি ওর কথা আমিও জানি না। তবে স্পষ্ট শুনতে পাই, বুঝতেও পারি।’
চিকিৎসক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন আদনানের চোখের দিকে। সামনে দাঁড়ানো কিশোরটিকে আর কিশোর মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে নতুন একটা সূর্য উঠেছে জরুরি বিভাগে। আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে তার মন, হাসপাতাল।
এ ফাঁকে বেনেবউটি উড়ে এসে বসল টেবিলে।
বাটারফ্লাই নিডল হাতে চিকিৎসক এগিয়ে গেলেন বেনেবউয়ের দিকে। বাইরের গাছের ডালে কখন যেন উড়ে এসে বসেছে পাখির ঝাঁক। ঝাঁকের মধ্য থেকে একটা বুলবুলি সুর করে গেয়ে উঠল :
যে-বুক জুড়ে সূর্য ওঠে
সে-বুক খুলে দেখবে তুমি…
পরিযায়ী এক নীলকণ্ঠ পাখির ঝাঁকও বসেছে গাছের মগডালে। ওদের কণ্ঠস্বর কর্কশ। ডাকে ক্যাক—ক্যাক সুরে। ওড়ার সময় ডাকে চক—চক—চক করে। অথচ এখন ডাকছে মিষ্টি সুরে। কী আশ্চর্য! এ সুর কোথায় পেল নীলকণ্ঠ পাখি?             আদনানের মনে জেগে ওঠা প্রশ্নটা শুনে মগডাল থেকে নেমে একটা নীলকণ্ঠ পাখি বলল, ‘তোমার বুকের আকাশে হেসে ওঠা সূর্যের আলোর ছেঁায়া মধুর করে দিয়েছে আমাদের কণ্ঠ। তোমার জন্য ভালোবাসা, আ…দ…না…ন ! ভা…লো…বা…সা…!’
ভালোবাসার কথা শুনে খুশি হয়ে গেল আদনান।
সঙ্গে সঙ্গে বুকের ঘরে নতুন সূর্যের আলোর ঝলকও টের পেয়ে গেল। আর তখনই ওর মাথার মধ্যে ভেসে উঠল বীজগণিতের নতুন এক ফর্মুলা :
সাহস + দক্ষতা +ভালোবাসা= বিশ্বজয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button