
সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। আকাশের লাল রঙটি নীলচে হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারের সাথে মিশতে চাইছে। অন্য কোনো প্রান্তরে এসময় নিরবতা নেমে আসাতে থাকে। কিন্তু এই জায়গাটা একদম বিপরীত। পাখিদের কল-কাকলীতে যেন কান পাতা দায়। কিচির-মিচির, কুহু-কুহু, ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ, ঘুটুর-ঘুটুর… যত রকমের পাখির ডাক তুমি কল্পনা করতে পারো— সব যেন এখানে, এই সময়টায় মিলেমিশে এক আজব ধরনের শব্দে পরিণত হয়েছে।
ঠিক এই সন্ধেবেলাটায় পাখিরা এমনটা হৈচৈ করে কেন, আমি ঠিক জানি না। তবে অনেকে বলেন— সকাল-সকাল পাখিরা তো বাসা থেকে উড়ে দূরে যায় খাবারের সন্ধানে- নানান কাজে। তারপর বিকেলে বাড়ি ফিরে এসে ছানাদের খোঁজ নেয়., সঙ্গীর সাথে গল্প করে— সারাদিন কি করলো, কিভাবে কাটলো, কি কি হলো, কিসের কিসের দেখা পেলো… এরকম হাজারো গল্প চলে। ওসবের সত্যি-মিথ্যেও আমি ঠিক জানি না। তবে এটা ঠিক, তুমিও খেয়াল করে দেখবে— পাখিরা সারাদিন পর ওদের বাসায় ফিরে এসে নানা রকম শব্দ করে।
যে জায়গাটার কথা বলছি সেটা একটা পার্ক। পরিচিত নাম— পৌর এডওয়ার্ড পার্ক। বগুড়া জেলার প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা থেকে এক মিনিট হাঁটলেই তুমি এই পার্কে ঢুকে পড়বে। সাতমাথা জায়গাটা কেমন একটু বলে রাখি। বিভিন্ন দিক থেকে সাত-সাতটি রাস্তা এসে এখানে একটা চত্বর ‘বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ার’-এ মিলে গেছে। বুঝতেই পারছো জায়গাটা বেশ ব্যস্ত। তার ঠিক কাছেই এমন একটি সবুজ গাছের মায়া মাখানো খোলামেলা পার্ক থাকতে পারে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু আছে। শুধু আছেই না, এটা গড়ে ওঠা শুরু হয়েছিল সেই ১৯০১ সাল থেকে। হিসেব দেখেই বুঝতে পারছো পার্কটা কত প্রাচীন।
পার্কে গাছপালা তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে পুকুর, হাটার জায়গা, ব্যায়াম করার জায়গা, শিশুদের খেলার জায়গা। আর আছে এক অদ্ভুত চিড়িয়াখানা। অদ্ভুত বলছি এজন্য যে, সেই চিড়িয়াখানায় হাতি-ঘোড়া-বাঘ-ভাল্লুক থাকলেও সেগুলো নড়ে-চরে না। তুমি বোধহয় বুঝতে পারছো— ওগুলো মূর্তি। আরেকটু খুলেই বলি— শহরের ভেতরে শিল্পী আমিনুল করিম দুলালের তৈরি করা ‘কারুপল্লী’ নামের চমৎকার একটা স্টুডিও ছিল। অসংখ্য শিল্পকর্ম ছিল সেখানে। শিল্পী মরে যাবার পর সেটা যখন অভিভাবকহীন হয়ে গেল তখন স্টুডিওটা ভেঙ্গে ফেলার মতো অবস্থা চলে এলো। ২০১৩ সালে শহরের মেয়র সাহেব শিল্পকর্মগুলি এখানে নিয়ে এসে সংরক্ষণ করেছেন। পশুপাখির মূর্তিগুলি একেবারে ‘লাইফ সাইজ’। দেখে খুব মজা পাবে।
পার্কের ভেতরেই আছে ১৮৫৪ সালে স্থাপন করা ‘বগুড়া উডবার্ণ পাবিলক লাইব্রেরি’। তারমানে হচ্ছে এই লাইব্রেরিটি পার্কটি থেকেও পুরনো। লাইব্রেরি ভবনটি ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় এটা আর ব্যবহার করা হচ্ছে না। বইপত্র যা ছিল সব নিয়ে যাওয়া হয়েছে নতুন একটি ভবনে। আবার যার নামে এই পার্কটি— রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড, তারও একটি আবক্ষ মূর্তি দেখতে পাবে এখানে। এটা স্থাপন করেন নবাবজাদা সৈয়দ আলতাফ হোসেন। তখন তো ব্রিটিশ শাসন চলছিল এই উপমহাদেশে। তাই সম্রাটের নামেই পার্কটির নাম রাখা হয়।
পার্কটির কাজ শুরু হয় ১৯০১ সালে, এটা আগেই বলেছি। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলতে থাকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। ভেতরে ‘আনন্দ সরোবর’ নামের যে পুকুরটি আছে সেটাও খনন করা হয় তখনই। কাজটি করার জন্য টাকা খরচ করেন কাজলার জমিদার আনন্দ চন্দ্র সেন। পার্কের পশ্চিম দিকে ‘গাছের ঘর’ আর পাহাড়ের মতো কিছু ব্যাপার-স্যাপার আছে। এগুলো ১৯১৩ সালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এন. এল বাগচি তৈরি করান। বুঝতেই পারছো, পার্কটি বিভিন্ন সময়ে নানাকাজে সমৃদ্ধ হয়েছে।
সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে এখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ‘স্বাধীনতা চত্বর’। এই স্থাপনা যেমন মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের স্মরণ করাবে, তেমনই সাংস্কৃতিক পরিবশেনার জন্য নতুন জায়গা করে দেবে।
যেকোন সময় তুমি পরিবারের সাথে চলে এসো পার্কটি দেখতে। মুগ্ধ হবেই। সবুজ গাছে ভরা এই পার্কটি সত্যিই যেন এই ব্যস্ত শহরের ফুসফুস। আর যদি পাখিদের সেই দারুণ হৈচৈ শুনতে চাও আসবে হবে বিকেলে, সন্ধ্যের ঠিক আগে।