জীবনী
Trending

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রথম বাঙালি শহীদ প্রফুল্ল চাকী

শাহানূর শাহিন

প্রফুল্ল চাকীর ডাক নাম ফুলু, সাংগঠনিক নাম দিনেশ চন্দ্র রায়। বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত বিহার গ্রামে ২৭ অগ্রহায়ন ১২৯৫ সনে (১০ ডিসেম্বর ১৮৮৮) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা রাজ নারয়ণ চাকী আর মা স্বর্ণময়ী দেবী।
পূর্বপুরুষ পাবনা জেলার অন্তর্গত চাঁচকিয়া গ্রাম থেকে বগুড়ায় আসেন। স্থানান্তরিত হয়ে দক্ষিণ বগুড়ায় করতোয়া নদীর তীরে সাজাপুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন চাকী পরিবার। পরবর্তীকালে এই পরিবার সাজাপুর গ্রাম থেকে নিবাস গুটিয়ে চলে যান দুই মাইল উত্তর—পূর্বে মাদলা গ্রামে। পরে মাদলা গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন বগুড়া শহর থেকে উত্তরে নাগর নদীর তীর ঘেষা ইতিহাসের বিখ্যাত বিহার গ্রামে। এখানেই থিতু হয় চাকী পরিবার। ভাই—বোনদের মধ্যে প্রফুল্ল চাকী পঞ্চম। তারা মোট ছয় ভাইবোন।
প্রফুল্লর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বগুড়া সদরের নামুজা জ্ঞানদা মধ্য ইংরেজি স্কুলে। পড়ালেখাতে তিনি খুব মনোযোগী ছিলেন। স্কুলে যাওয়ার সময় ক্লাসের পাঠ্য বিষয় নিয়ে কথা বলতেন আর স্কুল ছুটির পর ফিরে আসার সময় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতেন। প্রফুল্ল সেই স্কুল থেকে মাইনর পাস করে ১৯০২ সালে রংপুর জিলা স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ব্রিটিশ সরকার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি যুক্ত হন। বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সময় ইমার্সনের অর্থনীতির দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে রংপুর জিলা স্কুল ত্যাগ করে প্রফুল্ল চাকীসহ ২০০ জন ছাত্র ঐতিহ্যবাহী কৈলাশরঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেই সময় ‘যুগান্তর’ পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রকুমার ঘোষ রংপুরে আসেন একটি বৈপ্লবিক গুপ্ত সমিতি স্থাপন করতে। বুকের তাজা রক্তে সমিতির প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে প্রফুল্ল চাকী দীক্ষা গ্রহণ করেন। সেই প্রতিজ্ঞার একটি ছিল প্রয়োজন হলে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে হবে।
১৯০৬ সালে কলকাতার বিপ্লবী বারীন ঘোষ সাংগঠনিক সফরে রংপুর যান। সেখানে প্রফুল্ল চাকীর কর্মস্পৃহা দেখে তাঁকে সাথে নিয়ে কলকাতায় ফেরেন। ১৯০৬ সালে বাংলা প্রদেশে গুপ্তহত্যার প্রথম প্রচেষ্টা হয়। পূর্ববঙ্গের তৎকালীন ছোট লাট ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যা করাই বিপ্লবীদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। ব্যামফিল্ড ফুলারের ধুবড়ী থেকে রংপুর হয়ে কলকাতা যাওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনা মতো রংপুর রেলস্টেশন থেকে এক মাইল দূরে রেললাইনের নিচে ব্যাটারি লাগিয়ে একটি বোমা রাখা হলো। আরেকটি সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যদি বোমাটি না ফাটে তাহলে প্রফুল্ল চাকী ও পরেশ মৌলিক লাল লণ্ঠন দেখিয়ে বিপদ সংকেতপূর্বক গাড়ি থামাবে এবং প্রফুল্ল চাকী রিভলবার দিয়ে ফুলারকে হত্যা করবে। কিন্তু ছোট লাট ফুলার সাহেব ট্রেন যাত্রা স্থগিত করে স্টিমারে যাওয়ার জন্য এই অভিযান ব্যর্থ হয়।
এবার ফুলার সাহেব নৈহাটি স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে গন্তব্যস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। প্রফুল্ল চাকীর ওপর ভার পড়লো একক অভিযানের। প্রফুল্ল ব্যাগে করে বোমা নিয়ে নৈহাটি স্টেশনে হাজির হয়েছে। ফুলারের স্পেশাল ট্রেন প্ল্যাটফর্মে অবস্থান করছে হুইসেলের জন্য। প্রফুল্ল প্ল্যাটফর্মে যেই ঢুকতে গেছে এমন সময় একজন পুলিশ এসে তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে গেট বন্ধ করে দিল। ঠিক সেই সময় স্পেশাল ট্রেনটিও ছেড়ে দিলো। এবারও বেঁচে গেলেন ফুলার সাহেব।
তৎকালীন কলকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিট্রেট ছিলেন কিংসফোর্ড সাহেব। তিনি স্বদেশী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিপ্লবীদের লঘু অপরাধে গুরু দণ্ড দিতে শুরু করলেন। তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সম্পাদক ভুপেন্দ্রনাথ দত্তকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেন। ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারি এই ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় দল। এবারও এই অপারেশনের দায়িত্ব এলো প্রফুল্ল চাকীর ওপরে। তার সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত করা হয় আর এক বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে। দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই দুইজন বিপ্লবী ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। প্রফুল্ল চাকী হলেন ‘দীনেশ চন্দ্র রায়’ ও ক্ষুদিরাম বসু হলেন ‘দুর্গাদাস সেন’। অপারেশনে যোগ দেওয়ার আগে তাঁরা কেউ কাউকে চিনতেন না।
১৯০৮ সালের ২৯ এপ্রিল মোজাফ্ফরপুর পৌছেন দুই বিপ্লবী। সঙ্গে নেন সে সময়ের হাতে তৈরি বোমা। ওইদিন তাঁরা ঘটনাস্থল রেকি করেন। সন্ধ্যায় কিংসফোর্ড ইউরোপিয়ান ক্লাবের ঘোড়ার গাড়িতে (ফিটন গাড়ি) করে যাতায়াত করার বিষয়টি নিশ্চিত হন তাঁরা। ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় গিয়ে অবস্থান নেন ইউরোপিয়ান ক্লাবের প্রবেশদ্বারের পাশে। এক পর্যায়ে গাড়িটি ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে দু’জন সেই গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করেন। বিস্ফোরণের পরপরই দু’জন দুদিকে ছুটে পালান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে ওই গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। তাঁর গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলেন ব্যারিস্টার কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা। বোমা হামলায় ওই দুই ব্রিটিশ নারী নিহত হন।
বিপ্লবী দু’জন দুই পথে পালাতে শুরু করেন। এদিকে ব্রিটিশ সরকার হামলাকারী দু’জনকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ জারি করে। প্রফুল্ল চাকী সমস্তিপুর রেলস্টেশনে পৌঁছে কলকাতার ট্রেনের খোঁজ নিতে গেলে রেলওয়ের এক কর্মচারি বুঝতে পারেন তিনি বিপ্লবী। তিনি প্রফুল্লকে ট্রেনযোগে কলকাতা যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি যে কামরার যাত্রী ছিলেন, একই কামরায় যাত্রী ছিলেন ব্রিটিশ পুলিশের এক বাঙালি সাব—ইন্সপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জী। তিনি প্রফুল্ল চাকীকে বিপ্লবী হিসেবে সন্দেহ করে আটকানোর চেষ্টা করেন। সে সময় পালানোর চেষ্টা করেন প্রফুল্ল চাকী। স্টেশনের অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে গেলে অবস্থা বেগতিক দেখে পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিজের কাছে থাকা পিস্তল দিয়ে মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মাহুতি দেন প্রফুল্ল চাকী। সেটি ছিল ১৯০৮ সালের ২ মে। অপরদিকে ক্ষুদিরাম বসু পালাতে গিয়ে ওয়ানী রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন ক্ষুদিরাম। ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে আদালতে তোলা হয়। আদালতের বিচারক তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেন। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। যুগে যুগে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের জন্য যাঁরা লড়াই করেছেন, তাঁদেরই রাষ্ট্রদোহী ও সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
প্রফুল্ল চাকী বিশ্বাস করতেন মানুষ মরে না— এই যে আসা—যাওয়া চলছে মানুষের ইচ্ছার ফলেই। আরো বলতেন— মা’র সুদিন হলে বেঁচে থাকার ইচ্ছে করতেম অনেকদিন— এমন দুর্দিনে এসেছি আমরা সবাই— যার দীনহীন অবস্থা, তারি ওপর নিষ্ঠুর অসুরদের আঘাত, যদি এই মা’র উদ্ধারের জন্য পিছপাও হই, তাহলে মানুষ জন্মেছিলাম কিসের জন্য— মা আমাদের কাছে যা চাইছেন, কিঞ্চিৎ যদি করে যেতে পারি, তাহলে তো জন্ম সার্থক।
দেশমাতৃকার জন্য একের পর এক ব্যর্থ মিশনে থেমে থাকেনি বিপ্লব। প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরামের আত্মবলি মৃতপ্রায় জাতির মধ্যে জীবনীশক্তির সঞ্চার করলো এবং দেশের যুবকদের মধ্যে আত্মোৎসর্গের প্রেরণা যোগাল, তাই তাঁদের পরেও আমরা আরও অনেক প্রফুল্ল ও অনেক ক্ষুদিরামের সাক্ষাৎ পেয়ে ধন্য হয়েছি। জাতি মহান এই বিপ্লবীদের যুগে যুগে উন্নত চিত্তে স্মরণ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button