বিজ্ঞান চিন্তা
Trending

ভবিষ্যতের এই হুমকি আমাদেরই মোকাবিলা করতে হবে

আবু সাইয়ীদ

পদার্থের তিনটি অবস্থা কঠিন, তরল এবং বায়বীয়। মানুষের জীবন ধারণের জন্য কঠিন, তরল এবং বায়বীয়—এই তিনের গুরুত্ব অপরিসীম। খাবার হিসেবে মানুষ বিবিধ কঠিন এবং তরল পদার্থ গ্রহণ করে থাকে আর শ্বাস প্রশ্বাসে অক্সিজেন বা বায়ুবীয় পদার্থ গ্রহণ করে থাকে। খাবার বা কঠিন পদার্থ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে কয়েক সপ্তাহ, পানি ছাড়া বাঁচতে পারে কয়েক দিন কিন্তু অক্সিজেন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে মাত্র কয়েক মিনিট। খাবার এবং পানির জন্য মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয় কিন্তু বাতাসের জন্য কোন সংগ্রাম করতে হয়না। প্রকৃতি থেকে সহজেই এবং তা বিনা মূল্যেই গ্রহণ করতে পারে মানুষ। অনেকটা অবচেতন ভাবেই প্রতি মুহুর্তে প্রকৃতি থেকে বাতাস প্রহণ করছে মানুষ। কঠিন পদার্থ তো বটেই তরল পদার্থ গ্রহণেও মানুষ কে এক ধরণের প্রস্তুতি নিতে হয় কিন্তু বাতাস গ্রহণের জন্য কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয় না। তাই মানুষের জীবন ধারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাতাসের গুরুত্বকে মানুষ আলাদা ভাবে বিবেচনায় নেয় না।

কিন্তু আজ যখন বিশ্বব্যাপী দূষিত বাতাস মানুষের ভবিষ্যৎ কে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে তখন এ নিয়ে আর কোন নিরবতা পালনের সুযোগ নেই। সারা পৃথিবীতে দূষিত বাতাসের পরিমাণ ক্রমেই বেড়ে চলছে। আর দুর্ভাগ্য জনক হলেও সত্যি যে দূষিত বাতাসের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। ২০১৮ সাল থেকে সুইস সংস্থা ‘আই কিউ এয়ার’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। আর প্রতি বছরই বাংলাদেশ দূষিত বাতাসের তালিকায় শীর্ষে থাকছে। ১৯ জানুয়ারি ২০২২ তারিখ সকাল ১০টা ১১ মিনিটে ঢাকার এ কিউ আই ২৬৯ এবং এরপরে অবস্থান করা শহর উহান ও দিল্লির এ কিউ আই যথাক্রমে ২৫২ ও ২১৪ এ কিউ আই। বাতাস দূষিত হওয়া মানে বাতাসে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড এবং ওজনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া।

কেন বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তন এবং পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে? নিঃসন্দেহে এটি একটি দীর্ঘ আলোচনা এবং বিপর্যয়ের শুরুও অনেক আগে থেকেই। মানুষ যখন প্রকৃতি থেকে বেড়িয়ে প্রকৃতি বিরুদ্ধে কাজ শুরু করলো তখন থেকেই। শুরুতে এই বিপর্যয় সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও দিন দিন মানব সমাজ ধ্বংসের হুমকির পর্যায়ে পৌঁছেছে । এই বিপর্যয় মনুষ্য সৃষ্ট-মানুষের উন্নত জীবন ধারণ তথা ভোগ বিলাসের জন্য গৃহীত বিবিধ পদক্ষেপ পরিবেশকে ক্রমাগত দূষিত করেছে। খাদ্য, কৃষি, আবাসন, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সহ বিবিধ যান্ত্রিক কার্যক্রম-প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিবেশের জন্য ক্ষতি হতে পারে এমন সব কর্মকাণ্ড আমরা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি।

কৃষিপণ্য উৎপাদনে আমরা বিষাক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করছি। খাদ্য প্রস্তুত করতে ব্যবহার করছি বিভিন্ন কেমিক্যাল। পরিবেশ দুষণ করে এমন সব উপকরণ, ইট, সিমেন্ট প্রভৃতি দিয়ে আমরা নির্মাণ করছি আমাদের আবাসন তথা বিভিন্ন অবকাঠামো। পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে আমরা যে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করছিতা— ও দূষণ করছে পরিবেশ কে।

আজকের যে পরিবেশ বিপর্যয় তা মনুষ্য সৃষ্ট। আমাদের বিভিন্ন কার্য কারণে সৃষ্ট এই এমন এক ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে পারমাণবিক যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থায় গিয়ে আমরা পৌঁছেছি। আর তাই এই বিপর্যয় থেকে আমাদের উদ্ধার পেতেই হবে এবং উদ্যোগ আমাদেরই নিতে হবে। জীবন ধারণ আমাদের করতেই হবে। অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান সবই আমাদের জন্য জরুরী; প্রতি নিয়ত ঘর থেকে বেড়িয়ে পরিবহন ব্যবহার করতেই হবে। আমরা আদিম প্রাকৃতিক জীবনে তো ফিরে যেতে পারবোই না, এমনকি, আমাদের যে বর্তমান আধুনিক জীবন যাপন সেখান থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের জন্য দুরহ। তাহলে কি পরিবেশ বিপর্যয় থেকে আমারা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবো না? পরিবেশ বিপর্যয় মেনে নিয়ে আসন্ন নিশ্চিত মানব জীবনের ধ্বংস কে নিরবে মেনে নেবো?

না, অবশ্যই আমরা তা মেনে নেবো না। দীর্ঘ সময় পরিবেশ বিপর্যয় রোধে মানুষ নিরব থাকলেও এখন মানুষ ক্রমাগত এ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠছে। কারণ গুলো খুঁজে বের করে তার প্রতিকারের জন্য সোচ্চার হচ্ছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৯৯৫ সাল থেকে। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় জলবায়ু সম্মেলনের ২৬ তম আসর কপ—২৬। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শুন্যে নামিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এটি এক দীর্ঘ মেয়াদী পদক্ষেপ।

কিন্তু বলাবাহুল্য কপের কার্যক্রম কে যথেষ্ঠ নয় বলে মনে করা হচ্ছে। তাই বিভিন্ন পর্যায় থেকে দেশে দেশে প্রতিবাদ হচ্ছে, তাগিদ দেয়া হচ্ছে দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানোর পদক্ষেপ নেয়ার। জল বায়ু পরিবর্তন রোধে এই শতাব্দীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষ পথে নামছে। এই প্রতিবাদে যুক্ত হচ্ছে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা পর্যন্ত। বাংলাদেশ ও এই প্রতিবাদের বাইরে নয়। বাংলাদেশে ও প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তি উভয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে জাতিসংঘের উদ্যোগেই হোক, আর উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি পর্যায়েই হোক- যে উদ্যোগ এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়েছে তা মোটেও আশা ব্যঞ্জক নয়। মানবজাতির জন্য হুমকি স্বরূপ, সবচেয়ে বিপদ জনক এই বিষয়টি নিয়ে যতটা সোচ্চার হওয়ার দরকার ছিল, ঠিক ততটা সোচ্চার আমরা হতে পারিনি। আমাদের প্রতিবাদ এবং উদ্যোগের মধ্যে দায় সারা ভাব রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটে, এমন সব কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। আহার, পোশাক পরিচ্ছদ, আবাসন, যাতায়াত, প্রভৃতি বিষয়ে অবাধ ভোগ বিলাস থেকে বেরিয়ে এসে ন্যুনতম জীবন যাপনে ফিরে আসতে হবে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপকরণ পরিহার করে পরিবেশ বান্ধব উপকরণ ব্যবহারের দিকেমনোযোগি হতে হবে। আমাদেরকেই এই হুমকি মোকাবেলা করতে হবে এবং আমাদের পৃথিবীকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button