
বাপ মরেছে কয়েক সন আগে। আপন বলতে আছে এক দুখিনী মা। ছেলেটা তাই মাকে ভালোবাসে জীবনের চেয়েও বেশি। সেই মায়ের হলো অসুখ। এমন এক অসুখ যার নিদান কেউ জানে না। বদ্যি আসে। নাড়ি টেপে। কিন্তু রোগ ধরতে পারে না।
কবরেজ আসে। এ গাছের পাতার রস দেয়। ও গাছের শিকড় বেটে দেয়। মায়ের অসুখ বেড়ে চলে। বেড়েই চলে।
গুনিন আসে। ওঝা আসে। ঝাড়ফুঁক দেয়, পানিপড়া দেয়। মন্ত্র পড়ে লম্ফ—ঝম্ফ করে। কিন্তু মায়ের অসুখ কমে না।
মা দিনে দিনে শুকিয়ে যায়। বড় বড় চোখ দুটো ঢুকে যায় কোটরের মধ্যে। শরীরে মাংস বলতে কিছু থাকে না। হাড়ের ওপর শুধু চামড়া লেপে দেওয়া। মায়ের নড়ন নাই, চড়ন নাই। দশবার ব্যাকুল স্বরে মা মা বলে ডাকলে একবার হয়তো ক্ষীণকণ্ঠে সাড়া দেয়।
বদ্যি বলে, এ রোগ সারানো আমার কম্মো নয়।
কবরেজ বলে, এমন রোগী বাপের জন্মে দেখিনি।
গুনিন টিকি নাচিয়ে বলে, কিছুই বুঝছি না।
তার মানে ওরা জবাব দিল। জবাব দেওয়া মানে এই রোগী আর সুস্থ হবে না। তার মানে মা মারা যবে নির্ঘাত।
ছেলে আর কী করে!
মায়ের করণা চেহারা দেখে তার বুক ফেটে যায়। অসুখে মা ছটফট করে। ছেলের মনে হয় তার কলিজায় কেউ বাঘের নখে আঁচড় কাটছে।
সে মনের দুঃখে ছুটে বেড়ায়। এর কাছে যায়, ওর কাছে যায়Ñ ওগো তোমরা আমার মাকে বাঁচাও!
সবাই তাকে সান্তনা দেয়। আল্লাহকে ডাকতে বলে। কিন্তু ছেলের মন বুঝ মানে না।
তো এইরকম একদিন আনমনে হাঁটতে হাঁটতে ছেলে গেল তাদের গাঁয়ের শেষ প্রান্তে। সেখানে বুড়ো বটগাছ। ছেলে গিয়ে বসল বুড়ো বটগাছের ঝুরিতে হেলান দিয়ে। বৈশাখ মাসের দুপুর। চারপাশের পানিতে ঝাঁ ঝাঁ রোদের খেলা। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। পিঠ বেয়ে কুলকুল ঘাম নামে। বটগাছের তলাটা মায়ের বুকের মতো ঠান্ডা। ক্লান্তিতে ছেলের চোখ বুঁজে আসতে চায়।
হঠাৎ মনে হলো কেউ তাকে ডাকছে।
চমকে উঠে ছেলে এদিকে ওদিকে চায়। কই কেউ তো নেই?
আবার সে চোখ বোঁজে।
আবার ডাক।
ভূত নাকি!
না, ভূত নয়। ডাকছে তাকে শুকপাখি। শুকপাখিকে দেখে ছেলের বুকে আশা জাগে। শুক হচ্ছে সবজান্তা। সে কোথায় কোথায় উড়ে বেড়ায়। কেউ তাকে খুঁজে পায় না। কিন্তু সে হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেয়। আর একবার তার দেখা পেলেই মুশকিল আসান। সব বিপদের নিদান তার জানা আছে।
ছেলেটা হাতজোড় করে বলল, আমার মাকে বাঁচাও শুকপাখি। মা ছাড়া আমার কেউ নাই। আমার মায়ের কঠিন অসুখ।
শুকপাখি মাথা নেড়ে বলল, আমি জানি। বলেই তোমার কাছে এসেছি। তোমার মাকে বাঁচানোর একটাই উপায় আছে।
কী উপায় বলো শুকপাখি?
হৃদকমল ফুলের রস খাওয়াতে হবে।
কোথায় আছে সেই ফুল?
অনেক দূরে।
হোক দূর। যত দূরেই হোক, আমাকে সেই ফুল আনতেই হবে। তুমি শুধু বলে দাও জায়গাটা কোথায়?
এখান থেকে নৌকা নিয়ে চলতে চলতে তুমি পৌঁছুবে উল্টাস্রোতের গাঙে। সেই গাঙ পেরোলে পাবে ঘূর্ণি বিল। সেই বিলের পানি সব সময় ঘোরে মানে পাক খায়। সেই পাকে যা পড়ে তা নিমেষে তলিয়ে যায়। সেই ঘূর্ণি বিলের পরে তুমি পড়বে কালিদহে। এতই গহীন সেই দহ যে সেখানে এক শ লগি জোড়া দিলেও থৈ পাবে না। কালিদহ পার হলে পাবে ক্ষীরোদ বিল। সেই বিলের মাঝখানে আছে হৃদকমল ফুল। সেটা এনে তার রস খাওয়ালেই তোমার মা সুস্থ হয়ে উঠবে। পরমায়ু পাবে হাজার বছর।
ছেলে উঠে দাঁড়াল, আমি চললাম।
শোনো শোনো! – শুকপাখি তাকে থামাল- আগে ভালো করে শোনো। তোমাকে রওনা দিতে হবে ভোরে সূর্য ওঠার আগে। আর ফুল নিয়ে ফিরে আসতে হবে ঐদিনই সূর্য ডোবার আগে। যদি ফিরতে না পারো তবে তোমার মাকে আর বাঁচানো যাবে না।
পরদিন সূর্য ওঠার আগে ছেলে অসুস্থ মায়ের পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। খুব তাড়াতাড়ি যেতে হবে। গাঁয়ের সবাই তার সাহায্যে এগিয়ে এল। গাঁয়ের সবচেয়ে দ্রুতগামী ছিপনৌকা দেওয়া হলো তাকে। গাঁয়ের বন্ধুরা জোরে বৈঠা মেরে তাকে এগিয়ে দিল অনেকখানি। চলনবিলের সীমানার কাছে এসে ওরা ফিরে গেল।
উল্টা স্রোতের গাঙে পৌঁছে ছেলেটা পড়ল বিপদে। যেদিকে এগুতে চায় নৌকা যায় তার উল্টোদিকে। কী করে! ভুস করে ভেসে উঠল একটা কুমির। বলল- আমি তোমার কথা জানি। আহা মায়ের জন্য তোমার কত দরদ! আমি তোমাকে সাহায্য করব। তুমি তোমার বৈঠা আমার মুখে ধরিয়ে দাও।
বৈঠা কামড়ে ধরে কুমির সাঁতার কাটতে শুরু করল। নৌকাও চলতে শুরু করল। ছেলেটা শুধু বৈঠা ধরে রাখল। কুমির তাকে পার করে দিল উল্টাস্রোতের গাঙ আর ঘূর্ণি বিল। তারপর বললÑ বিদায় বন্ধু। এই পর্যন্তই আমার সীমানা। কালিদহে নামা আমরা গুরুর নিষেধ। তুমি কালিদহ পার হতে চাইলে শুশুকদের ডেকে নাও। ফেরার সময় আবার আমাকে পাবে।
এই বলে বিদায় নিল কুমির।
ছেলেটা ভাবছে, এখন কী করে!
এই সময় শুশুকরা তার পাশে দাঁড়াল। তারা তাকে পার করে দিল অতল কালিদহ। ক্ষীরোদ বিলের সীমানায় বিদায় নিল শুশুকরা।
ক্ষীরোদ বিলের পানি ক্ষীরের মতো ঘন। এখানে বৈঠা চলে না। নৌকা একচুলও এগোয় না। এই সময় এগিয়ে এল বিশাল এক কচ্ছপ। টেনে নিয়ে গেল নৌকাকে হৃদকমল ফুলের কাছে।
ছেলেটা ফুল তুলে নিল দুহাতে বুকের কাছে। আহা এই ফুল আমার মায়ের জীবন ফিরিয়ে দেবে।
কিন্তু সূর্যের দিকে তাকিয়ে তার বুক ছ্যাঁত করে উঠল। সূর্য ইতোমধ্যে মাঝের আকাশ পেরিয়ে গেছে। ছেলেটা মনে মনে সময়ের হিসাব কষল। নাহ্ বোধহয় মাকে আর বাঁচানো যাবে না। সে ফিরতে ফিরতে সাঁঝ উতরে যাবে।
এই সময় মাথার ওপরে উড়ে এল শুকপাখি। বলল- তুমি ফিরতি পথে রওনা দাও। আমি সূর্য না ডোবার ব্যবস্থা করছি।
শুকপাখি উড়ে গেল সূর্যের শ্বশুরবাড়ি। তার শ্যালককে খুলে বলল সব কথা। যদি ঐ ছেলেটার মাকে বাঁচাতে হয়, তাহলে দেরি করিয়ে দিতে হবে সূর্যকে। সূর্যের শ্যালক বলল- আচ্ছা!
সূর্য তখন বারো ঘোড়ার রথে চড়ে হাম—হুম করে ছুটে চলেছে পশ্চিম পানে। হঠাৎ তার শ্যালক এসে দাঁড়ায় সামনে- ভগ্নিপতি ভগ্নিপতি একটু দাঁড়াও।
হাজার হলেও বড় কুটুম। সূর্য আর কী করে। রথ থামাল। শ্যালক বললÑ চলো মা তোমার জন্য পিঠে বানিয়েছে। আগে পিঠে খেয়ে তারপর পশ্চিমে যেয়ো।
সূর্য আমতা আমতা করে- কিন্তু আমার দেরি হয়ে যাবে যে!
হোক দেরি। একদিন দেরি হলে কিছু ক্ষতি হবে না।
সূর্য বলল- আরে পাগল। পৃথিবীর নিয়ম টলে যাবে যে। তারচেয়ে বরং শাশুড়িকে বলিস আমি রাতে পিঠে খেতে আসব।
না, না, অতক্ষণ অপেক্ষা করলে পিঠে নষ্ট হয়ে যাবে। তোমাকে এক্ষুণি যেতে হবে। বেশি দেরি হবে না। যাবে, দুটো পিঠে মুখে দেবে আর চলে আসবে।
শ্যালকের জোড়াজুড়িতে সূর্যকে রাজি হতেই হলো। সে বাধ্য হলো শ্বশুরবাড়ি যেতে।
এই ফাঁকে ছেলেটা হৃদকমল নিয়ে পৌঁছে গেল মায়ের কাছে। সেই ফুলের রস মুখে দিতেই সুস্থ হয়ে উঠল মা।