জীবনী
Trending

রূপকথার মহারাজা হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসেন

মেহেদী হোসেন

এমন কেউ কি আছে যে মৎস্যকন্যার কথা শোনেনি, যার শরীরের ওপরের অংশ একজন তরুণীর মতো কিন্তু নীচের অংশ মাছের লেজের মতো। যে মৎস্যকন্যা সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এসে এক রাজকুমারের প্রেমে পড়েছিল! কিংবা শোনেনি রাজকন্যা আর মটরদানার কথা। দুর্যোগের মধ্যে এক অর্বাচীন তরুণী রাজপ্রাসাদে এসে দাবী করল যে সে একজন রাজকন্যা। তখন সে সত্যিকারের রাজকন্যা কিনা সেটা পরীক্ষার জন্যে রাজপ্রাসাদের লোকেরা একটা খাটের ওপর একটা মটরদানা রেখে তার ওপর দশটা পুরু তোষক আর দশটা ভারী বিছানার চাদর বিছিয়ে তার ওপর কথিত রাজকন্যাকে ঘুমাতে দিল। পরীক্ষা করে দেখতে চাইল সে ঐ খাটে অতগুলো তোষক আর চাদরের ওপর শুয়ে একেবারে নীচে রাখা ঐ ছোট্ট মটর দানাটাকে অনুভব করতে পারে কিনা। যদি পারে, তবেই প্রমাণিত হবে যে সে একজন রাজকন্যা।
জানি, এসব গল্প নিশ্চয় তোমরা শুনেছো। শুধু তোমরা না, সারা বিশ্বের তাবৎ শিশুরা এসব গল্প শুনে আমোদিত হয়; কারণ এই গল্পগুলো বিশ্বের একশ’ পচিশটারও বেশী ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
তোমরা কি জান, কে এই লেখক, যার লেখা এত জনপ্রিয়; এত এত ভাষায় যার লেখা অনুবাদ করা হয়েছে?
তিনি হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসেন। জন্ম নিয়েছিলেন ইউরোপ মহাদেশের দেশ ডেনমার্কে। বাল্টিক সাগরে চারশ’ দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ ডেনমার্ক; যার তিনটি প্রধান দ্বীপের একটি হলো ফিউনেন। সেই ফিউনেনের প্রধান শহর ওডেনসের একটি ছো্ট্ট ঘরে ১৮০৫ সালে জন্ম নেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষ। আর মৃত্যুবরন করেন ৪ আগস্ট, ১৮৭৫, কোপেনহেগেনে ৭০ বছর বয়সে।
ভাবছো, এত বড় সাহিত্যিক, নিশ্চয় জন্ম নিয়েছিলেন কোন অভিজাত পরিবারে, সোনার চামচ মুখে। না, তিনি জন্ম নিয়েছিলেন খুব সাধারণ একটা পরিবারে। তাঁর বাবা হ্যান্স এন্ডারসেন ছিলেন একজন মুচি, জুতা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা লাভ করেছিলেন। আর মা অ্যান মেরি অ্যান্ডারসড্যাটার ছিলেন নিরক্ষর। অন্যের বাড়িতে থালা—বাটি ধোয়ার কাজ করতেন।

এরকম একটা পরিবারে জন্ম নেয়া কতই না কষ্টের। তাকে ভর্তি করা হয়েছিল দরিদ্রদের জন্যে নির্ধারিত স্কুলে। তবে তার বাবা তাকে বড় হবার আদর্শে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তিনি অ্যারাবিয়ান নাইটস এর গল্প জানতেন। সেগুলো শুনিয়ে ছেলেকে রূপকথার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলেন। তিনি তাকে মহামানবদের গল্প শুনিয়ে বড় মানুষ হবার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ১৮১২ সালে তার মা ওডনে্স থিয়াটারে কাজ করনে এবং তিনি মায়ের সাথে সেখানে গিয়ে নাটক দেখার সুযোগ পান। নাটক ছিল তার খুবই প্রিয়। বাড়িতে এসে তিনি নাটকের অংশগুলো নিজে নিজে অভিনয় করতেন।

১৮১৬ সালে তার বাবা মারা যান। তার পরিবার পড়ে নিদারুণ অর্থকষ্টে। মায়ের একার উপার্জনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় এন্ডারসেনকেও উপার্জনের কাজে লাগিয়ে দেন। তাকে কোচ অ্যান্ড হির্শফেল্ড টেক্সটাইল কারখানায় তাঁতি হিসাবে কাজ করতে হয়েছিল এবং পরে লরডিস আরন্টরুপস তামাক কোম্পানিতেও কাজ করতে হয়েছিল। কিন্তু এসব কাজে আদৌ তার মন বসেনি। তার ধ্যান—জ্ঞান ছিল নাটক করা।

১৮১৮ সালে তার মা আবার বিয়ে করেন। ফলে এন্ডারসন নি:সঙ্গ হয়ে পড়েন। নিঃসঙ্গ হয়ে সিদ্ধান্ত নেন ভাগ্যান্নেষণে তিনি ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে যাবেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো অর্থ তার কাছে ছিল না। তিনি ডাক গাড়ির বস্তার মধ্যে লুকিয়ে কোপেনহেগেন যান। সঙ্গে নিয়ে যান একজন পত্রিকা সম্পাদকের একটি শুপারিশপত্র আর যৎসামান্য সঞ্চয়ের অর্থ। সেখানে বিভিন্ন লোকের সহায়তায় নাটকে অভিনয়ের চেষ্টা চালিযে যান। লেখাপড়াও চালিয়ে যান।

একসময় বুঝতে পারেন নাট্যাভিনয় তার দ্বারা হবে না। তখন তিনি নাটক লেখার চেষ্টা করেন। বেশ কিছু ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর, তিনি মুলাতেন (১৮৪০;“দ্য মুলাটো”) এর জন্য স্বীকৃতি অর্জন করেন, যা দাসত্বের কুফল চিত্রিত করে এমন একটি নাটক। এছাড়া তিনি ভ্রমনকাহিনী, আত্মজীবনী, উপন্যাস ইত্যাদি প্রকাশ করেন। তার প্রথম রূপকথার সংকলন প্রকাশিত হয় ১৮৩৫ সালে, যেখানে দি টিন্ডারবক্স, লিটল ক্লজ ও বিগ ক্লজ এবং থামবেলিনা গল্পগুলো ছিল।

১৮৩৪ সালে উপন্যাস ‘দি ইমপ্রোভিজেটর’ প্রকাশের পর তার জনপ্রিয়তা দেশ—বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই বইটা বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়। এছাড়াও তিনি অনেক গান, কবিতা, নাটক ইত্যাদি লেখেন।

কিন্তু তার বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার কারণ তার রুপকথার গল্পগুলো। তার বিভিন্ন সময়ে লেখা রূপকথার গল্পগুলো নিম্নরূপ:
“দ্য অ্যাঞ্জেল”(১৮৪৩), “দ্য বেল”(১৮৪৫), “ব্লকহেড হ্যান্স”(১৮৫৫), “দ্য এলফ মাউন্ড”(১৮৪৫), “স¤্রাটের নতুন পোশাক”(১৮৩৭), “দ্য ফার—ট্রি”(১৮৪৪), “দ্য ফ্লাইং ট্রাষ্ক”(১৮৩৯), “দ্যা গ্যালোশেস অফ ফরচুন”(১৮৩৮), “দ্য গার্ডেন অফ প্যারাডাইস”(১৮৩৯), “দ্য গবলিন অ্যান্ড দ্য গ্রোসার”(১৮৫২), “গোল্ডেন ট্রেজার”(১৮৬৫), “সুখী পরিবার”(১৮৪৭, “দ্য আইস—মেইডেন”(১৮৬১), “এটি বেশ সত্য”(১৮৫২), “দ্য জাম্পার্স”(১৮৪৫), “ছোট ক্লজ এবং বড় ক্লজ”(১৮৩৫), “লিটল ইডার ফুল”(১৮৩৫), “দ্য লিটল ম্যাচ গার্ল”(১৮৪৫), “দ্য লিটল মারমেইড”(১৮৩৭), “লিটল টুর”(১৮৪৭), “সবচেয়ে অবিশ্বাস্য জিনিস”(১৮৭০), “দ্য নটি বয়”(১৮৩৫), “দ্য নাইটিংগেল”(১৮৪৩), “দ্য ওল্ড হাউস”(১৮৪৭), “ওলে লুকোই”(১৮৪১), “দার্শনিকের পাথর”(১৮৫৮), “দ্য প্রিন্সেস অ্যান্ড দ্য পি”(১৮৩৫), “লাল জুতা”(১৮৪৫), “দ্য রোজ এলফ”(১৮৩৯), “ছায়া”(১৮৪৭), “দ্য রাখাল এবং চিমনি সুইপ”(১৮৪৫), “দ্য স্নো কুইন”(১৮৪৪), “দ্য স্নোম্যান”(১৮৬১), “দ্য স্টেডফাস্ট টিন সোলজার”(১৮৩৮), দ্য স্টর্কস”(১৮৩৯), “একজন মায়ের গল্প”(১৮৪৭), “দ্য সুইটহার্টস; বা, দ্য টপ অ্যান্ড দ্য বল”(১৮৪৩), “দ্য সোয়াইনহার্ড”(১৮৪১), “ট্যালো ক্যান্ডেল”(১৮২০), “দ্য টিপস”(১৮৬৩), “থাম্বেলিনা”(১৮৩৫), “দ্য টিন্ডারবক্স”(১৮৩৫), ‘দ্য ট্রাভেলি কম্প্যানিয়ন”(১৮৩৫), “কুৎসিত হাঁসের বাচ্চা”(১৮৪৩), “বুড়ো মানুষ যা করে তা সর্বদা সঠিক”(১৮৬১), “বুনো রাজহাঁস”(১৮৩৮)।

এই রূপকথার গল্পগুলো এতই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে তাঁর মৃত্যুর দেড়শ’ বছর পরও বিশ্বব্যাপী সমান সমাদৃত। আগেই বলেছি, এই গল্পগুলো ১২৫ টিরও বেশী ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তাঁর জন্মদিন দোসরা এপ্রিল আন্তর্জাতিক শিশুদের বই দিবস হিসাবে পালিত হয়। তাঁর রচিত শিশুদের গল্প নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র, কার্টুন, এনিমেশন, ইত্যাদি।

ডেনমার্ক জুড়ে এন্ডারসনের জনপ্রিয়তা বিস্ময়কর। সে দেশের এমন কোন শহর নেই, যেখানে তাঁর নিজের বা কোন রুপকথার চরিত্রের একটা ভাস্কর্য বা স্থাপত্য নেই। তাঁর জন্মশহর ওডেনসে আছে এন্ডারসন যাদুঘর। ওডেনসের শিশুপার্কগুলোতে কিংবা রাস্তার পাশে যত্র—তত্র পাওয়া যাবে বিভিন্ন রুপকথার চরিত্রের নয়নাভিরাম প্রতিমূর্তি।

ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে বাল্টিক সাগরের মধ্যেই একটা বড় পাথরের ওপর স্থাপন করা হয়েছে তাঁর বিখ্যাত রুপকথার চরিত্র ‘দি লিটল মারমেড’ বা ছোট্ট মৎস্যকন্যার মূর্তি। সমুদ্রের মধ্যে বিশাল একখানা পাথরের ওপর এমনভাবে এটি স্থাপন করা হয়েছে, মনে হয় এইমাত্র পানির মধ্যে থেকে উঠে এসে হাঁটু ভেঙে বসল। আড়চোখে তাকিয়ে আছে সমুদ্রের দিকেই। ভাটার সময় কিছুটা পানি ভেঙে ওটার কাছে পেঁৗছানো যায়। জোয়ারের সময় পানিতে ডুবে যায়। প্রতিদিন দেশ—বিদেশের প্রচুর দর্শণার্থী ওটা দেখতে যায়।

ওডেনস আর কোপেনহেগেনের মধ্যে এন্ডারসেনকে নিয়ে রয়েছে একটা নিরন্তর লড়াই। ওডেনস দাবী করে এন্ডারসেন জন্মেছিলেন ওডেনসে, তাই তিনি তাদের সম্পদ। আবার কোপেনহেগেন দাবী করে ওডেনসে জন্ম নিলেও তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে কোপেনহেগেনে। তাঁর সাহিত্য প্রতিভার বিকাশও ঘটেছে সেখানে। তাই তিনি কোপেন হেগেনেরই সম্পদ। এন্ডাসেন মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় দেড়শ’ বছর হলো। অথচ তাকে নিয়ে দুই নগরীর এই মধুর লড়াই আজো থামেনি। হয়তো থামবেও না কখনো। ভেবে দেখ কী বিরল সৌভাগ্য!

হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসেন এর জীবনী পড়ে আমরা কী শিখলাম? কে কোথায় জন্ম নিল সেটা বড় কথা নয়, সততা আর নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করলে যে কেউ জীবনে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারে। বিশ্ব জয় করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button