উপন্যাসপ্রবন্ধ
Trending

শিশুতোষ চলচ্চিত্র কেন প্রয়োজন?

সুপিন বর্মন

চলচ্চিত্র হলো দ্রুত সময়ে মনকে প্রভাবিত করার একটি সৃজনশীল ও প্রযুক্তিগত মাধ্যম, যা একই সাথে চলমান চিত্রের মাধ্যমে গল্পের প্রয়োজনে নির্বাচিত চরিত্রের প্রস্ফুটন ঘটায়। শব্দ, সঙ্গীত, সম্পাদনা, রং বিন্যাস চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় উপাদান, যা ক্যামেরার লেন্সে ধারণকৃত চিত্রের সাথে উল্লেখিত উপাদানগুলোর সমন্বয় সাধনের মধ্যদিয়ে একটি পূর্নাঙ্গ চলচ্চিত্রের জন্ম দেয়। সব ভিডিওচিত্র চলচ্চিত্র নয় তবে সব চলচ্চিত্রই আবার ভিডিওচিত্র। চলচ্চিত্রের নির্মাণ ও গল্পের উপস্থাপনার উপর ভিত্তি করে শিশু চলচ্চিত্র ও বড়দের চলচ্চিত্রের বিভাজন আমরা সচরাচর দেখতে পাই, যদিও এর কোন অফিসিয়াল সংজ্ঞা ও বিভাজনের কোন ব্যাখ্যা আমরা দেখতে পাইনা।

তবে দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে চলচ্চিত্রকে আমরা পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নামে বিভাজন করে থাকি। মূলত ৬০ মিনিট এর অধিক দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রকে পূর্ণদৈর্ঘ্য ও ৬০ মিনিটের কম দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রকে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বলা হয়। তবে বর্তমানে আমরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বলতে ৪০ মিনিটের কম দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রকেই বুঝি। এছাড়াও চলচ্চিত্রের আরও অনেক বিভাজন আছে। কোন স্থান, কোন ব্যক্তি, কোন বস্তু কিংবা কোন ঘটনার বাস্তবিক সত্য ঘটনার আলোকে গবেষণালব্ধ বিষয়বস্তুর উপর নির্মিত চলচ্চিত্রকে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র বা ডকুমেন্টারি ফিল্ম বলা হয়, আর কাল্পনিক গল্প নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রকে ফিকশন ফিল্ম বলা হয়। এভাবে গল্প ও কাহিনির উপর নির্ভর করে আমরা ফিকশন ও নন ফিকশন ফিল্ম বলে বিভাজন করি। আবার কারিগরি প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে কোন ঘটনা বা গল্পকে কাল্পনিক চরিত্রে রূপায়ন করে তা কার্টুন কিংবা কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে নির্মিত চলচ্চিত্রকে অ্যানিমেশন ফিল্ম বলি, যেখানে কোন চরিত্রে অভিনয় শিল্পী জীবন্ত নয়। সাধারণত দর্শকের প্রকারভেদ বা বয়সের উপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র নির্মাতাগণ তাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ করে থাকেন। কিছু চলচ্চিত্র আছে যা কেবল শিশুদের জন্যই নির্মিত হয়ে থাকে আবার কিছু কিছু চলচ্চিত্র সব ধরনের দর্শকের জন্য নির্মিত হয়। বড়দের চলচ্চিত্র ও শিশুদের চলচ্চিত্রের মধ্যে বড় একটি পার্থক্য হলো গল্প ও উপস্থাপনা। কেবল চলচ্চিত্রের গল্পের কারনেই চলচ্চিত্রটি শিশু চলচ্চিত্র কিনা তা সহজেই বোঝা যায়। শিশুদের মনন শৈলির উপর ভিত্তি করে শিশুদের গল্প চলচ্চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করাই হলো শিশু চলচ্চিত্র। সহজ কথায় শিশুদের উপযোগী । শিশুদের জন্য নির্মিত শিশুতোষ গল্পের চলচ্চিত্রই হলো শিশু চলচ্চিত্র। পৃথিবীর সকল দেশেই শিশু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। শিশুদের চলচ্চিত্র সব বয়সী দর্শকদের ভাল লাগে ফলে শিশু চলচ্চিত্রের প্রসার ও ব্যাপকতা অনেক। কিন্তু বড়দের চলচ্চিত্র সব বয়সের দর্শকদের জন্য নয় ফলে এটি কেবল একটি শ্রেণির দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। শিশু চলচ্চিত্রগুলোর আবেদন সব সময়ই থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে তেমন একটা শিশু চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে না। অথচ আমাদের জন্য শিশুতোষ চলচ্চিত্রের গুরুত্ব খুবই বেশি। একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র শিশুদের মনোজগতের চিন্তা ও চেতনার পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে ফলে শিশু চলচ্চিত্র একটি শিশুর জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিশুদের মনন ও চিন্তার প্রসার ঘটে খুব সহজেই। তাদের মস্তিষ্ক এতটাই তীক্ষè যে, শিশুরা যা দেখে তা খুব সহজেই মনে রাখতে পারে অর্থাৎ দ্রুত ধারণ করার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। চলচ্চিত্র যেহেতু একই সাথে দৃশ্য ও শব্দের বিষয়, সেহেতু চলচ্চিত্র খুব সহজেই শিশুদের মনোজগতে প্রবেশ করে। সঙ্গত কারণে চলচ্চিত্রে আপনি শিশুদের যে বার্তা দিবেন তাই প্রভাবিত করবে শিশুদেরকে। এ বিষয়ে শিশুতোষ কিছু চলচ্চিত্রের উল্লেখ্য করা যেতে পারে- ছুটির ঘন্টা, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, মাটির ময়না, দীপু নাম্বার টু, পথের পাঁচালি, হ্যাভেন অব দ্য চিলেড্রেসহ অসংখ্য দেশি ও বিদেশি চলচ্চিত্র রয়েছে। প্রতিটি চলচ্চিত্র শিশুদের মনোজগতের চিন্তা ও চেতনার জায়গা তৈরি করে দেয়। কখনো আনন্দ কখনো বেদনার মাধ্যমে রহস্যময় গল্পের সাথে পরিচিত হয়। এক একটি চলচ্চিত্র এক একটি বার্তা বহন করে, শিশুদেরকে বিনোদিত করে, নৈতিকতা ও স্বাধীনতার শিক্ষা দেয়। বর্তমান এমন একটি সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে শিশুরা বাবা মায়ের তৈরি লেখাপড়া আর ভাল রেজাল্টের জালে বন্দী হয়ে গেছে। শিশুরা এতোটা মানসিক চাপে পড়ে গেছে যে, তারা এর থেকে মুক্তি চায়। দিনে দিনে খেলার মাঠ সংকোচিত হচ্ছে। বিনোদনের জায়গা হয়েছে কম্পিউটার টেবিল আর বারান্দার ছোট্ট বেলকনি। এর বাহিরে ছুটে বেড়ানোর জায়গা নেই তাদের। ছুটির দিনগুলোতে এক্সজাম আর স্পেশাল ক্লাস। স্কুল, কোচিং আর টিউটরের ফাঁদে আটকা পড়েছে শিশুরা, ফলে দিনে দিনে শিশুরা অনেকটাই মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছে। শিশুর চিন্তার জগতটা হয়ে যাচ্ছে ছোট। সৃজনশীল কোন কাজে শিশুদের আগ্রহ থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাবা—মা। ফলে চলচ্চিত্র কিংবা অন্যান্য সাংস্কৃতিক মাধ্যমে শিশুরা তেমন কোন অংশগ্রহণ করার সাহস পায় না। নৃত্য, নাটক, গান, চিত্রাঙ্কন আর আবৃত্তিতে শিশুরা যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ার কথা তার সিকি ভাগও আমরা দেখতে পাইনা। বড়ই আপসোস ও মায়া লাগে এ সময়ের শিশুদের দিকে তাকালে। বর্তমানে শহরে বেড়ে ওঠা শিশুরা ছোট জানালায় দাঁড়িয়ে হা করে নিঃশ্বাস নেয়। তারা সিনেমা হল কি জিনিস এখনও সঠিক জানে না, বাবা মায়েরাও চায় না তার সন্তান সিনেমা দেখুক, তার সন্তান গান করুক, নাটক করুক, আবৃত্তি করুক- তথা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যুক্ত থাক। এই যখন অবস্থা তখন একটি শিশুর মনোজগত কতটা বিকলাঙ্গ হয় তা কেউ বোঝে না। একটি জিনিস লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় যে, আমাদের দেশে দিনদিন বৃদ্ধাশ্রম বাড়ছে, কারাগার, হাসপাতাল বাড়ছে। ছেলেমেয়েরা বড় বড় ডিগ্রি নিচ্ছে, বড় বড় চাকরি করছে, প্রচুর টাকা ইনকাম করছে কিন্তু নীতি—নৈতিকতা, আদর্শের জায়গা বাড়ছে না। পুত্র—কন্যা বৃদ্ধ বাবা—মাকে দেখছে না। পরিবার পরিজনের খবর রাখছে না, রোবটিক জীবন যাপন করছে। অর্থ ও সম্পদের পিছনে ছুটতে গিয়ে আদর্শিক জায়গা হারিয়ে ফেলছে। তাহলে কি দাঁড়ালো আমাদের? সন্তানেরা কেন এমন হচ্ছে, কেন এমনটা ঘটছে? এর জন্য দায়ী আমরাই। আমরা সন্তানকে ঘরের বাহিরে খেলতে যেতে দিতে চাই না, লেখাপড়ার ক্ষতি হবে বলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেতে দেই না। খারাপ রেজাল্ট করবে বলে বিনোদনের সময়ে তিনজন টিউটর বেশি রাখি। আমাদের চাই গোল মেডেল, চাই গোল্ডেন এ প্লাস। আমাদের সন্তানেরা তাই এনে দিচ্ছে। তাহলে তার কাছে আর কি চাই, বলুন? কখনো কি বলেছি বাবা—মা, আত্মীয়—স্বজনকে দেখার কথা, পাড়া—মহল্লার মানুষের খোঁজ খবর রাখার কথা। বলিনি। বলেছি শুধু যে, বাবা তোমাকে গোল্ডেন এ প্লাস পেতে হবে। সবার সেরা ছাত্র হতে হবে। বড় ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তার হতে হবে। বড় অফিসার হতে হবে। সন্তানদের কখনোই বলা হয়নি ভাল মানুষ হতে হবে। সন্তানেরা আমাদের কথা রেখেছে। আমরা যা চেয়েছি তাই হয়েছে।

যাই হোক, শিশু চলচ্চিত্র হয়তো আমাদের ছেলেকে বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানাবে না, তবে নীতি—নৈতিকতার শিক্ষা দিবে। তার অবচেতন মনটাকে জাগিয়ে তুলবে। মায়া মমতার কথা শেখাবে। আর যাই হোক চোর কিংবা ডাকাত হওয়ায় অনুপ্রাণিত করবে না। কাজেই একটি শিশুর জন্য শুধু চলচ্চিত্রই নয়, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা খুবই জরুরী। তা নাহলে আমাদের শিশু কেবল টাকা বানানোর মেশিনই হবে। কিন্তু ভাল মানুষ হবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তবে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা একটি শিশু নিশ্চিত একজন মানুষ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button