
পর্দা ঠেলে অফিস কক্ষে পূর্ণিমা ম্যাডাম হন্তদন্ত হয়ে ডেকে ওঠেন, আপা!
টেবিলে ঝুঁকে হেডমিস্ট্রেস কী যেন লিখছিলেন। আগন্তুকের কণ্ঠস্বর তাঁর কানে পৌঁছে, তবু তিনি চোখ না তুলেই বলেন- বসুন।
পূর্ণিমা ম্যাডাম চেয়ার টেনে বসলেই পারেন,কিন্তু না, তিনি বসেন না। বরং আরও একটু এগিয়ে এসে হেড মিস্ট্রেসের কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে আবার ডাকেন,আপা!হাতের কলম টেবিলে নামিয়ে রেখে আপা এতক্ষণে চশমার কাচের ওপার থেকে চোখ তুলে তাকান। অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
কী খবর পূর্ণিমা, এ রকম দেখাচ্ছে কেন তোমাকে!কী হয়েছে?
স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করেন পূর্ণিমা ম্যাডাম, গলা নামিয়ে বলেন,
না, তেমন কিছু না আপা।
কী ব্যাপার বলোতো! ক্লাসে কিছু ঘটেছে?
হেড মিস্ট্রেসের ভাবনা কেবল স্কুল আর ক্লাস নিয়ে, ছাত্র আর শিক্ষক নিয়ে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলকে তিনি দিনে দিনে সাজিয়ে তুলেছেন মনের মতো করে। তাই সব দিকে তাঁর প্রখর দৃষ্টি। সব কিছুর খোঁজ নেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। প্রায় বছর দশেক পর ক্লাস ফোরের রুটিন বদলে পূর্ণিমাকে দেওয়া হয়েছে ক্লাস-টিচারের দায়িত্ব। সাধারণ শিক্ষকের চেয়ে বেশ খানিক বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয় শ্রেণি-শিক্ষককে। একটা কিছু সমস্যা হতেই পারে ক্লাসে। কিন্তু পূর্ণিমা ম্যাডাম সেদিকে না গিয়ে টেবিলের উপরে সবুজ রঙের একটা খাতা নামিয়ে রেখে আবেগ জড়ানো কণ্ঠে জানান,
হঠাৎ এই খাতাটা পেলাম আপা।
হেড মিস্ট্রেস এবার খাতার দিকে তাকান। সবুজ কভারের খাতা। এ স্কুলের সব ছাত্রই ব্যবহার করে এমন খাতা। খাতার উপরে অর্ধচন্দ্রাকারে লেখা আছে স্কুলের নাম। তার নিচে ছাত্রের নামক, শ্রেণি-শাখা-রোল ইত্যাদি। এই খাতাটি এমন অসাধারণ কিছু নয়। অন্তত প্রথম দৃষ্টিতে তেমন কিছু ধরা পড়ে না। তাই তিনি জানতে চান,
কিসের খাতা?
ক্লাস ফোরের বাংলা খাতা।
তা বেশ। কোথায় পাওয়া গেল!
পুরানো আলমারি গোছাতে গিয়ে নিচের তাকে পেলাম।
খাতাটা নাড়াচাড়া করতে করতে আরো একটু এগিয়ে ধরেন হেডমিস্ট্রেসের সামনে। এতক্ষণে খাতার উপরে লেখা ছাত্রের নামটি তাঁর নজরে পড়ে। গদি আঁটা চেয়ারের খোঁড়লের মধ্যে মেরুদন্ড সোজা করে বসেন। হাত বাড়িয়ে খাতাটা তুলে নেন তিনি, বিস্ময়ে চোখ গোল করে তাকান। তারপর জানতে চান,
এতদিন কোথায় ছিল এ খাতা?
তা তো জানি না আপা!
জানো না?
না আপা। আমার জানা নেই। ক্লাস- টিচারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সব কিছুগোছগাছ করতে গিয়ে —-
বাক্যটা শেষ হয় না পূর্ণিমা ম্যাডামের। হেড-আপা মলিন খাতার উপরে আঙুল ছুঁয়ে গভীর মমতায় বলে ওঠেন নামটা দেখেছ খাতার উপরে?
ফুলের পরাগ ফোটার মতো শিল্পিত ভঙ্গিমায় উচ্চারণ করেন পূর্ণিমা দাশ,
শেখ রিসালউদ্দীন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওটাই তার স্কুলের নাম। কিন্তু সবাইচেনে রাসেল নামে।
পূর্ণিমা ম্যাডামের কন্ঠে অস্ফুটে উচ্চারিত হয়-
শেখ রাসেল।
হেডমিস্ট্রেস কিছুই বলেন না। রাসেলের নাম লেখা পুরনো মলিন খাতাটা বুকের উপরে নিয়ে ক্লান্ত শরীর চেয়ারের গহ্বরে হেলিয়ে দেন। চশমার আড়ালে দুচোখ তাঁর নিমীলিত। ধীরে ধীরে সেই চোখের কোনায় জমা হয় অশ্রুবিন্দু। তার-পর এক সময় তা গড়িয়ে পড়ে দু গ-বেয়ে। বেদনাপ্লুত এই মানুষটিকে আর বিরক্ত না করে পূর্ণিমা দাশ ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে অফিস থেকে।
স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পরও হেড-মিস্ট্রেস রাজিয়া মতিন চৌধুরী সেদিন আর কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারেন না। মনটা তাঁর শ্রাবণ আকাশের মতো ভার হয়ে আছে। রাসেলের সবুজ খাতা তিনি স্কুলে রেখে আসতে পারেন নি। কোথায় রাখা যায় ভেবে পাননি। এতদিন চোখের আড়ালে ছিল, এই খাতা নিয়ে কোনো ভাবনা হয়নি। কিন্তু এখন তিনি কী করবেন! লুকিয়ে রাখবেন? কোথায় লুকাবেন? আহা, এত গাঢ় সবুজ মলাটের খাতা! এ কি টিয়ে পাখির মতো প্রগাঢ় সবুজ! নাকি এই বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পতাকার মতো স্নিগ্ধ সবুজ! ল্যাবরেটারি স্কুলের সব ছাত্রের হাতে আছে এই একই খাতা। তবু মনে হয় চিরসবুজ রাসেলের খাতার মতো এমন ঘন সবুজ বুঝি আর হয় না। শেষ পর্যন্ত নিজের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে খাতাটি তিনি বাসায় নিয়ে যান।
পড়ন্ত বিকেলে বাসার লনে এসে ইজি চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে ব্যাগ থেকে খাতাটি বের করতেই তিনি চমকে ওঠেন- কোথায় সবুজ! ফড়িং-পাখার সবুজ নয়, পতাকার সবুজও নয়, কেমন করে যেন রাসেলের সেই খাতার মলাট লাল টকটকে হয়ে গেছে, রক্তের মতো লাল। বিস্ময়ে দুচোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। মাথা ঝিমঝিম করে। দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তবু তিনি চোখ মেলতেই দেখতে পান বাগানের সব জুঁই, বেলি, মল্লিকা- এরা সব গেল কোথায়! কোন জাদুবলে সব ফুল এমন রক্তরঙিন হয়ে গেল কে জানে সেই কথা!
গোধূলিবেলার রক্তিম আলোয় তিনি এবাররাসেলের খাতার পাতা উল্টান। কী যে সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে বাংলা লেখা! দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাতার পর পাতা জুড়ে লেখা আর লেখা, কোথাওকাটাকুটি নেই বললেই চলে। আবার আছেও একটুখানি। একটি পাতায় চোখ আটকে যায়। কলম ঘষে ঘষে নিজের লেখা এমনভাবে ঢেকে দিয়েছে, সেই কাটা-কুটিতেই বেশ এক রকম ছবির আদল পেয়েছে। মনে মনে ভাবনা হয়Ñছেলেটি কি রবীন্দ্রনাথের মতো করে ছবি আঁকার জন্য হাত মকশো করেছে? কিন্তু এ কী, প্রতি পৃষ্ঠায় যে ওর মায়ের নামসই দেখা যাচ্ছে! অভিভাবক হিসেবে ওর বাবা সই করেননি, করেছে ওর মা- ফজিলাতুন্নেছা।
বাবার সময় কোথায়! তিনিদেশের প্রধান।
কত রকম কাজ তাঁর! একটুখানি কাছে পাওয়াই ভার। ছেলের স্কুলের খাতা কখন সই করবেন তিনি!
রাজিয়ামতিন চৌধুরীর মনে পড়ে যায়Ñ আগস্টের পনেরোয় বঙ্গবন্ধু আসবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে, সেই রকমই কথা ছিল। দেশের প্রধান বলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়েরও প্রধান। পদের নামচ্যান্সেলর। বাংলায় বলে আচার্য। অথচ ছাত্রজীবনে এই বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বহিস্কার করেছিল, এখানকার কর্মচারিদের আন্দোলনে সহযোগিতা করার অপরাধে। ইতিহাসের কী যে নির্মম পরিহাস- সেই বহিস্কৃত ছাত্রটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আসবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।তাই নিয়ে কত তোড়জোড়! ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারিসবার মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার শেষ নেই। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের মধ্যে ল্যাবরেটারি স্কুলই-বা পিছিয়ে থাকবে কেন! এই স্কুলের সামনে দিয়েই তো বঙ্গবন্ধু যাবেন। দেশের প্রধানকে এত কাছে পাওয়া তো দুর্লভ এক সৌভাগ্যের ব্যাপার। পরিকল্পনা হয়- এই স্কুলের পক্ষ থেকেও তাঁকে দেওয়া হবে পুষ্পাঞ্জলি। এই জন্যে সমান আকৃতির ছয় জন স্মার্ট ছাত্র বাছাই করা হয়।
রাসেল তাদের দলনেতা। বেশ কদিন ধরে পুরো দলকে শেখানো হয় কোথায় কীভাবে দাঁড়াতে হবে, কেমন করে এগিয়ে যেতে হবে, কে মালা পরাবে,কীভাবে পুষ্পরেণু ছিটাতে হবে,এই সব নিয়ম কানুন । এত সব ট্রেনিং এর পরও শেষ বেলায় হেড মিস্ট্রেস তাদের দেখতে আসেন, প্রত্যেককে বুঝিয়ে বলেন কাল সকালে কত বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজ তারা করতে যাচ্ছে, প্রত্যেকের কাঁধে হাত রেখে নির্দেশ দেন- পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম পরে চলে আসবে কেমন? রাসেলের সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়ান, রাসেলের দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিয়ে বলেন-
এ কী! তোমার দু’হাতে এত রঙকেন?
রাসেল লজ্জা পায়, মুখ নামিয়ে নেয়। হেডআপা তবু থুতনি ধরে জিজ্ঞেস করেন,
এত লাল রঙ কোথায় পেলে?
রাসেল মুখ খোলে। লাজুক ভঙ্গিতে জানায়- পরপর দুই ভাইয়ের বিয়েতে রঙ- খেলা হয়েছিল, সেই তখন হাতে মেহেদি দেওয়া হয়, তারপর অনেক ধুয়েও রঙ উঠছে না।
তাই বলে এত লাল!
লজ্জায় লাল হয়ে যায় রাসেল। নিজের মেহেদি রাঙা হাত টেনে নিয়ে বলে, সাবান দিয়ে যতই ধুই, ততই লাল হয়।
হেড আপা এক চিলতে হেসে ওঠেন, রাসেলের সঙ্গে তামাশা করেন,তুমি ঘুমিয়ে গেলে নতুন ভাবী এসে আবার মেহেদি লাগিয়ে দেয় না তো!
লাজুক রাসেল হেড আপার সামনে থেকে পালাবার পথ খোঁজে। আপা সেটা টের পান। সবাইকে বিদায় দেবার আগে আবারও মনে করিয়ে দেন- সকালবেলা সবাই চলে এসো সময় মতো।
পরদিন সকাল হয়েছে ঠিকই। রাতের আঁধার সরিয়ে সূর্য এসেছে আলোর দেয়ালি হাতে। রক্তিম আভায় আকাশ রাঙিয়ে সূর্য উঠেছে অন্যান্য দিনের মতোই। কিন্তু সূর্যোদয়ের সেই বর্ণবিভা দেখা হয়নি রাসেলের। রাত পোহাবার সামান্য একটু আগে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে নিভে গেছে তার জীবনবাতি। সূর্যের নয়, মেহেদি রঙের রক্তপ্লাবনে তলিয়ে গেছে সজীব সবুজ রাসেল।
সে রাতে ঘুমোতে যাবার আগে বাবার গলা জড়িয়ে কানের কাছে মুখ নামিয়ে গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয় রাসেল,কাল সকালে তোমাকে আমি মালা পরিয়ে দেব আব্বু।
বাবাতো অবাক।
তুমি পরাবে মালা?
হ্যাঁ, আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে আমিই দেব ফুলের মালা।
‘মালা মানেই তো জ্বালা’- মনে মনে স্বগতোক্তি করেন বঙ্গবন্ধু। প্রকাশ্যে বলেন অন্য কথাÑ কী ফুলের মালা? গোলাপ থাকবে তো?
গোলাপ প্রিয় বাবাকে আশ্বস্ত করে রাসেল, জানিয়ে দেয়, মালার মাঝখানে থাকবে রক্তগোলাপ। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে রাসেল সানন্দে বলে-
আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে তোমাকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা।
হা হা করে হেসে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। দু’হাতে জড়িয়ে পুত্রের গালে চুম্বন এঁকে দিয়ে বলেন,
এখন ঘুমাও দেখি, সকালে নেব তোমার লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। এখন চুপচাপ ঘুমাও।
পিতা-পুত্রের মধ্যে সেই বুঝি শেষ সংলাপ,শেষ সাক্ষাৎ এবং হয়তো শেষ আলিঙ্গনও।
প্রতারক সকাল আসার একটু আগেই সব শেষ।রাতের শেষ প্রহরে একদল উন্মত্ত বুনো হাতি তছনছ করে দেয় সাজানো বাগান। ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটিতে সহসা রক্তের হোলি খেলা করে পথভ্রষ্ট নরপিশাচ সৈনিকের দল। ঘরের মেঝেতে রক্ত, সিঁড়িতে রক্ত, রক্তের ফিনকি এসে দেয়ালের গায়ে এঁকেছে নিষ্ঠুর আল্পনা। এত রক্ত ছোট্ট রাসেল সইবে কী করে!মা-বাবা-চাচা, দুই ভাই, মেহেদি রাঙা দুই ভাবী- সব হারিয়েছে তার। শিশুর অন্তরে তবু জাগে বাঁচার আকাক্সক্ষা। ঘাতকদের কাছে সে কাতর মিনতি জানায়, ‘মায়ের কাছে যাব আমি। আমাকে মায়ের কাছে যেতে দাও।’
মায়ের বুকের চেয়ে নিরাপদ ঠিকানা বুঝি আর কোনো শিশুর কাছেই হয় না। অবুঝ রাসেলকে সেই ঠিকানায় পৌঁছে দেবার কথা বলে হিংস্র দানবেরা সহসা রাইফেলের গুলিতে ঝাঁজরা করে দেয় বুক। অতটুকু শিশুর বুকের রক্তের ধারা গিয়ে মেশে তার মা-বাবা ভাই-ভাবীর রক্তের সঙ্গে। রক্তের রঙ এত লাল! এত টকটকে লাল! সকালে স্কুল- প্রাঙ্গণে বাবাকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা জানানো হয়নি বটে, তবে কি রাসেল সেদিন সূর্য ওঠার আগেই রক্তগোলাপ শুভেচ্ছা জানিয়ে গেল!
ভাবতে ভাবতে শুধু ক্লান্ত নয়, ভয়ানক বিপর্যস্ত এবং বিপন্ন হয়ে পড়েন রাজিয়া মতিন চৌধুরী, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। ক্লাস ফোরের নতুন ক্লাসটিচার পূর্ণিমা দাশ এতদিন পরে রাসেলের খাতা আবিস্কার করে তাঁকে এ কোন স্মৃতির সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়ে গেল! এত সব স্মৃতির ঝাপটায় তাঁর বিপন্ন সত্তা অতি একান্তে আর্তনাদ করে ওঠে- তুমি তোমার খাতাটি কেন নিলে না রাসেল? এখন এই সবুজ খাতাটি আমি কী করে তোমাকে ফিরিয়ে দিই?