
সেই ছোটবেলায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন ঘরের দাওয়ায় বসে পড়ছিলাম। নানী করুণ সুরে গান গাইছিলেন। মা সেই গান শুনে ফুপিয়ে-ফুপিয়ে কাঁদছিলেন। মায়ের চোখে পানি দেখে আমি মায়ের কাছে গেলাম। মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম— মা কাঁদছো কেন? মা তখন চোখ মুছে উত্তর দিলেন— বড় হলে বুঝবে মা কেন কাঁদে?
নানী গ্রাম বাংলার বিয়ের গীত গাইছিলেন। বিয়ে বাড়িতে মা, খালা, নানীরা দলীয়ভাবে বিয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট যেসব গান গায় সেগুলোকেই সাধারণত বিয়ের গীত বলা হয়।
অনেক কাল আগের কথা। মানুষ দুঃখ-কষ্ট পেলে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদতো। সেই সুরেলা কান্নাই কালক্রমে গীত বা গান হয়ে ওঠে। একটা গীতের কিছুটা শোনাই তোমাদের—
‘কেমনে দিমুগো দয়ার কাজলক বিদায়
কলিজা জ্বর-জ্বর করে। কুনটি গেলে গো
কাজলের দয়ার আম্মা কাজলক বিদায় দেও।’
বিয়ের সময় কনেকে গোসল করানোর সময় গীত গাওয়া হয়। ডালা সাজানোর গীত তোমাদের শোনাই—
ডালা ডালা রঙ ডালাগো
ডালা হামার ফুল ডালাগো
ডালা দেখিয়ে আব্বা কান্দে গো
ডালা দেখিয়ে ঐ তক্তার কনে
হাসে গো…।
এসব বিষয়কে ঘিরেই এক-একটি গীত প্রচলিত আছে। এইসব গীতের সুনির্দিষ্ট কোন লেখকের নাম এখন পর্যন্ত গবেষণা করে জানা যায়নি। ধারণা করা হয় কালের পরিক্রমায় লোকমুখে সৃষ্টি হওয়া এসব গান বা গীত লোকজ গান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই গানগুলোকেই বিয়ের গীত বলা হয়। যেমন— ডালা সাজানোর গীত, গোসলের গীত ইত্যাদি। আরেকটি উদাহরণ দিই—
রাজু নদী দিয়ে ভাইসা যায়রে
রাজু সেন্দুরের কৌটা
রাজু সেইনা সেন্দুর শিশে দিয়েরে
রাজু নাচে নেকার-থেকার রাজু…।’
কিংবা আরেকটি—
‘পানি ফুটি রিনিঝিনি
পানি ফুটি কিনি
কারও হুকুমে তোমরা
ঢ্যালে দিলে পানি (২)
বাপ হামার সদাগর
মাও হামার রানি
তারি হুকুমে হামরা
ঢ্যালে দিলাম পানি।
একজন নারীর যখন বিয়ে হয়, নারীর বয়স যদি কম হয়, গীতওয়ালী আইওরা ( যেসব মহিলা এসব গীত ও গান গায়, নাচে তাদের গীতওয়ালী বা আইও বলা হয়) এরকম গীত গায়—
পানও আসে আরঙ্গে-আরঙ্গে হাইরে
গুয়া আসে ডাবরে-ডাবরে আরে কে
ঐনা পানও বাতাসে উড়ামু হাইরে
ঐনা গুয়া ডাবরে ভরিমু আরে কে
তাওনা দিমু দুধের ময়নাকে বিয়ে আরে কে..।
বিয়ের পরে সংসারে নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও নানারকম কষ্ট-বেদনার ঘটনা ঘটে। সেইসব ঘটনাকে ঘিরেও নানা রকম গীত হয়। মেয়ের শ্বশুর বাড়ির নানা বেদনার গল্প ফুটে ওঠে এসব গীতের ভেতর—
ঘরের ভিতরে আয়না ঝলমল করেরে
আন্ধার লাগবি ময়না বিদেয় হলে
আঙ্গনেকোনা ঝাড়– দিতে হলদে পাখি
দুয়ারে পরে বাঁকেরে আহারে আহা
তোমাকে না কয়া দিছনু হলদে পাখি
আব্বা কেংকা আছেরে আহারে আহা
তোমার আব্বা বিনোক করে কান্দেরে
ঘরের শোভা গেছেরে আহারে-আহা..।’
স্বামী-স্ত্রীর গভীর মধুর প্রণয়ও এইসব গীতে ফুটে ওঠে এভাবে—
‘কালো-কালো বাইগুনগো সোয়ামী
ধলা-ধলা ফাটা হাইগো
সেইনা বাইগুন তুলতে গো সোয়ামী
নখে ফুটলো কাঁটা হাইগো
মইলাম-মইলাম, মইলাম গো সোয়ামী
দারুণ নকের বিষে হাইগো…।’
আরেকটি শোনো—
‘বাংলা ঘরে বসেরে দামান
বাংলা লেখন লেখেরে কে
লিখনখানি লিখতেরে দামান
গাও ঘামিয়ে যায়ইরে
ছড়ের কনে গায়ে বাতাস করে রে কে…।’
বাবা-মা মরে যাওয়ার পর মেয়ের বাবার বাড়িতে তার আর আগের মত দরদ থাকে না। তখন সে মেয়েটি ভাই-ভাবির কাছে অনেকটা অবহেলিত হয়, তারই চিত্র যেন এই গীতটিতে ফুটে উঠেছে—
‘ভিটেত গাড়ছি একখান কদু গো
তাতি ধরছে দুইখান কদু গো
হামা খামু ভাবী ভাইয়ের আগিনের
কদু- জাংলার পাড়ে যেন যাইওরা গো
জাংলার কদু জানি ছিড়িও না গো
তোমার ভাই বুবু নিষেধ করিয়ে গেছে…।’
যৌতুকের বিষয়ও গীতে এসেছে। সেই সময় পণপ্রথার কথা শোনা গেলেও কিছু অঞ্চলে যৌতুকের কথাও উঠে এসেছে—
‘কাজল ফোটা আগিনেরে
আংনেত কে খেলাবি পাশা
কনের আছে ছোট বোন গো
আংনেত সে খেলাবি পাশা
কনের বাপে গপাইছে গো
দামান্দক গরু করবি দানে
গরু দিবের না পালে গো
দামান্দোক শাউরিক করবি দানে..।’
মেয়ে বিদায়ের যেমন গীত আছে তেমনি বউ বরণের গীতও আছে—
‘চারিমুরো ব্যাতেরি আড়া মধ্যে
আয়মাল খাড়া
আয়মালি যাবি পরগো দ্যাশো
কে বেন যাবি তার সাথে
ভাইয়ের আগে জুড়িমু করুণা
ভাবিক নিমু তার সাথে
পরদেশের মানসে গো কবি
দাসীক এনেছো সাথে- দাসী নয়কো
বান্দি গো নয়কো হামার কালুনী ভাবী…।’
আরেকটা শোনো—
‘আকাশ মারে আকাশের তারা
পুবে মারে ঝাঁকি লো বালি
কিও মতে নামিয়ে নিমু
জমিদারের বেটিক লো বালি-
কেমনে নামিয়ে নিমু
জমিদারের বেটিক
টাকা-পয়সা নাই মোর হাতে..।’
এরকম নানা গীত আছে এ বিয়েকে ঘিরে। আইও ও গীতওয়ালীরা দল বেঁধে গীত গায় ও নাচে। বিয়েবাড়ির এইসব চমৎকার গীত বলা যায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন আগের মতো করে বিয়েবাড়িতে গীত গাওয়া হয় না।
মা-খালা, নানী-দাদীরাও এখন আর গীত গায় না সেরকম। আমাদের আজকের প্রজন্ম এইসব গীত সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। এইসব গীত ও সুর সংগ্রহ, সংরক্ষণ করে রাখতে হলে অডিও ও ভিডিও করে রাখতে হবে।
সুর ছোঁয়া এইসব বিয়ের গীত বা গানের গভীরে লুকিয়ে রয়েছে লোকজ গানের খনি। তাই এই গীতের আবেদন মানুষের কাছে সব সময় থাকবে। গীত বা গানগুলো হলো গ্রামবাংলার গানের প্রাচীন ঐতিহ্য। আজ তোমাদের বগুড়া অঞ্চলের এসব গীত নিয়ে কিছুটা ধারণা দিলাম। বড় হয়ে বিভিন্ন গবেষকদের লেখা থেকে তোমরা আরো অনেক কিছু জানতে পারবে।