
অনেক খাল বিল জংগলের পথ পেরিয়ে, গভীর রাতে গ্রামের কাছাকাছি আসতেই দেখা হয়ে গেলো মাঝি কালু কাকুর সাথে।
বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে পাজড় ভাঙ্গা কান্নায়, ফুপিয়ে ফুপিয়ে বল্লো ‘‘বাজান সব শ্যাষ, মালতীরে ধরে নিয়ে গেছে ফজু মাতব্বর, আজ তিন দিন তার খোঁজ নাই, তাই রাত জাইগা আমার কলজা মা’রে খুঁজতাছি, যদি দেখা পাই, যাও বাজান বাড়ি যাও। দেখো কেউ যেন না দেখে”। এই বলে জঙ্গলের পথে হারিয়ে যায় কানু মাঝি।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই মৃদু হারিকেনের আলোয় মা কে দেখতে পেলাম। বাইরের বারান্দায় অপলক ঝাপসা চোখে বসে আছে। হাতের অস্ত্রটা খড়ের গাদায় লুকিয়ে রেখে, বাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে বাঁশের চাটায়ের মচমচ মৃদু শব্দ হতেই,
দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ কেঁদে ওঠে মা আমার।
আঁচলের সমস্তটা দিয়ে লুকিয়ে নিলো বুকের গভীর ওঁমে। যেমন করে জন্মের পর লুকিয়ে নিয়েছিলেন।
মার কান্নায় এক এক করে নিরব শব্দে খুলে যায় বাড়ির সকল দরজা। জেগে ওঠেন বাবা, ছোট বোন লিলি।
বাবার হাতে জলন্ত সিগারেট। একটার পর একটা ধ্বংস হয় দু’ আঙ্গুলের মাঝে। মনে হয় বাবা মা লিলি রাতে কেউ ঘুমায় না আমার নিরুদ্দেশ থেকে। যদি আমি আসি, সেই প্রতিক্ষায়।
মা হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় রান্না ঘরে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন, যেমন শিশু বেলায় খাইয়ে দিতেন।
বোনটা পুঁইলতার মাচার নিচে ওড়নায় মুখ চেপে অবিরাম কেঁদে চলেছে।
বাবা নিঃশব্দ চিৎকারে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে “শব্দ করে কেঁদো না, জানতে পারলে ওরা সব শেষ করে দেবে,
আর খোকা শোন ফজরের আগেই চলে যেও নইলে———।
মা—বাবা ও বোনটির নিরন্তর নিষ্পাপ কান্নার মাঝে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলাম। একটা পতাকার জন্য,
একটা স্বাধীনতার জন্য, একটা মানচিত্রের জন্য।
সব পেলাম।
সবাই ফিরে এলো,
এলো না
শুধু——————।