
নভেম্বরে ২০২২-এ ‘দিগদাইড় এমএইচ ইউনিহেল্প স্কুলে’ ৬০০ শিক্ষার্থীদের মাঝে চারা ও বীজ সরবরাহ করে ‘চলো পারিবারিক কৃষি করি, পরিবেশ গড়ি, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ভূমিকা রাখি’ উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়। ফসলচক্র শেষে, অংশগ্রহণকারী শিশুরা চারা রোপণ বা বীজ বপন থেকে শুরু করে গোটা জীবনচক্র নিয়ে সৃজনশীল রচনা লিখবে। রচনায় সৃজনশীলতা ও নিজের হাতে ফলানো ফসলের গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়কে পুরষ্কার প্রদান করা হবে এবং প্রথম স্থান অর্জনকারীর লেখাটি অনুশীলনের পরের সংখ্যায় প্রকাশিত হবে। দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোছাঃ হুমায়েরা আক্তার– এর রচনা প্রথম স্থান অর্জন করায় এ সংখ্যায় সেটি প্রকাশিত হলো।
জীবনচক্র
পেঁপে বাংলাদেশের একটি প্রধান ফসল। কাঁচা পেঁপে সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। পুষ্টিমানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই ফসল মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ কাজ করে। তাই বাংলাদেশে এখন পেঁপে চাষ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ‘পারিবারিক কৃষি করি, পরিবেশ গড়ি— জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ভূমিকা রাখি’— এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ‘অনুশীলন’ সম্পাদক এম রহমান সাগর ‘দিগদাইড় এম. এইচ. ইউনিহেল্প উচ্চ বিদ্যালয়ের’ মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের মাঝে পেঁপে সহ বিভিন্ন ফসলের চারা ও বীজ বিতরণ করেন। উদ্দেশ্য, যেন পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয় এবং সবুজয়ানও বাড়ে। যে সবুজয়ানের মাধ্যমে দেশে গ্রীণ হাউস গ্যাসের পরিমাণ কমবে। ফলে, সুস্থ জাতি এবং সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে উঠবে। যা জলবায়ু পরিবর্তনে অপরিহার্য অবদান রাখবে।
বিতারণকৃত চারা হতে আমি পেঁপে চারা পাই।
যেদিন চারা গাছটি দেওয়া হয় সেদিন বিকাল চারটায় আমি বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরি। বাড়িতে আসার পর বিদ্যালয়ের জামাটি পরিবর্তন করি। মাকে গিয়ে বলি আমাদের বিদ্যালয়ে আজ পেঁপে চারা সহ লাউ, কুমড়া ও বিভিন্ন ধরনের বীজ বিতরণ করেন ‘অনুশীলন’ সম্পাদক। মা বললেন, তুমি কী পেয়েছ ? আমি জানায়, আমি পেঁপে চারা পেয়েছি। আমাদের বাড়ির পাশেই একটি ছোট জমি আছে। মা বললেন, ওই জমিতে পেঁপে চারা রোপন করতে। আমি সেই দিনই গেলাম কোঁদাল নিয়ে জমিতে। যেখানে পেঁপে চারাগুলি রোপন করব, সেখানে আমি মাটি ভালোভাবে আলগা করে নিলাম এবং সুন্দর ভাবে মাটি উলট—পালট করে নিলাম। আমার মা বললেন, পেঁপে চারা মোটেও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। আমিও জানতাম যে, পেঁপে চারা কখনোই জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই পেঁপে চারার জন্য নির্বাচিত জমি হতে হবে জলাবদ্ধতা মুক্ত এবং সেচ সুবিধাযুক্ত। তার জন্যই আমি এই ছোট জমিতে চারা রোপনের সিদ্ধান্ত নেই। বাবা বলেছিলেন, পেঁপে চারা রোপনের আগে বীজতলায় উৎপাদিত চারার উন্মুক্ত পাতা গুলি ফেলে দিলে রোপন করা চারার মৃত্যর হার হ্রাস পায় এবং চারা দ্রুত বড় হয়। তারপর আমি চারা গুলোর উন্মুক্ত পাতা গুলি ফেলে দিলাম। পলি ব্যাগে চারাটি ছিল। আমি খুবই সাবধানে পলিব্যাগটি খুললাম, যাতে মাটির বলটি না ভেঙ্গে যায়। আমি জানতাম পড়ন্ত বিকেলে চারা গাছ রোপন করার উত্তম সময়। তাই, ওই বিকেলেই চারা গুলি রোপন করলাম। আর চারা রোপনের সময় লক্ষ্য রেখেছি, যাতে চারার গোড়া পলিব্যাগের মাটির যতো গভীরে ছিল তার চেয়ে গভীরে না যায়। সেদিকে লক্ষ্য রেখে চারা গাছ গুলি রোপন করি। তারপর আমি চারা গুলিতে পানি দেই এবং সুন্দরভাবে ঘীরা লাগাই। তারপর পরেরদিন সকালে আমি আবার চারাগুলিতে পানি দিতে যাই এবং চারাতে পানি দেই। এভাবেই আমি প্রত্যেকটা দিনই চারা গুলির যত্ন নিতে থাকি। আমার চারা গাছগুলো ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করে। চারা লাগানোর প্রায় এক মাস পর আমার বাবা চারাতে ইউরিয়া সার দেন এবং চারাগুলো বড় হতে থাকে। যখন চারাটির রোপনের প্রায় তিন মাস হয় তখন আমার চারা গাছে ফুল আসে। তারপর ফল কিছুটা বড় হওয়ার পর আমি ভালো ফলগুলি রেখে বাকি গুলো ছিড়ে ফেলি, কারণ আমার গাছে অনেক ফল ঠাসাঠাসি অবস্থায় ছিল। তাই ফল—গুলো ঠিকমতো বড় হতে পারত না এবং ফল গুলোর আকৃতি নষ্ট হয়ে যেত। তাই আমি ছোট ফলগুলি ছাঁটাই করে দিলাম। এভাবেই আমার গাছটিতে ফল গুলো বড় হয় এবং একদিন আমার গাছের পেঁপে পাঁকে। আমি খুবই খুশি হই। ওই পেঁপে আমার মা গাছ থেকে ছিড়ে নিয়ে আসেন এবং পেঁপেটি কাঁটে। পেঁপেটি কাঁটার পর আমার মা, বাবা, ছোট বোন এবং বড় আপু ও দাদিকে নিয়ে পেঁপে খাই। আমার মা আমাদের বাড়ির আশেপাশে অনেককেই পেঁপে দিয়েছে। আমি এই পেঁপে চারা গুলি রোপন করে খুবই উপকৃত হই এবং আনন্দিত হই।
এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে, এখন আমার মনে হয় আমিও দেশের পুষ্টি সংকট উত্তরনে ভূমিকা রাখতে পারবো। আর পুষ্টি সংকট নিরসন করা মানে—সুস্থ জাতি নিশ্চিত করা এবং দেশের জন্য অবদান রাখা।
আমি জানতাম পেঁপেতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন এ, ভিটামিন বি, ভিটামিন সি ও আয়রন বিদ্যমান। প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষনযোগ্য পাকা পেঁপেতে ৮৮.৪ ভাগ জলীয় অংশ, ০.৭ গ্রাম খনিজ, ০.৮ গ্রাম আঁশ, ১.৯ গ্রাম আমিষ, ০.২ গ্রাম চর্বি, ভিটামিন বি—১, ০.০৩ মি.গ্রা.বি—২, ৫৭০ মি.গ্রা ভিটামিন সি, ৮১০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন ও ৪২ কিলোক্যালরি খাদ্য শক্তি রয়েছে। এই ফল আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। পেঁপের ঔষধিগুন রয়েছে এবং পেঁপে খেলে আমাদের শরীরের প্রভৃতি রোগ নিরাময় হয় যেমনঃ অজীণ, কৃমি সংক্রমন, আলসার, ত্বকে ঘাঁ, এ্যাজমা, কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা, ডিপথেরিয়া, আন্ত্রিক ও পাকস্থালীর ক্যান্সার প্রভৃতি রোগ নিরাময়ে কাঁচা পেঁপের পেপেইন ব্যবহার করা হয়। পেঁপের আঠা ও বীজ কৃমিনাশক, প্লীহা যকৃতের জন্য উপকারী। তাই পেঁপে আমাদের মানব—দেহের জন্য খুবই উপকারী এবং রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের সবার উচিত শুধু পেঁপে চারা নয় বিভিন্ন ধরনে চারা রোপন করা। কেননা, এর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং আমাদের দেশকে সবুজয়ানে পরিনত করা যাবে। তাতে করে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান কমে যাবে। আমরা যদি গাছ লাগাই শুধু কার্বন ডাই অক্সাইড কমে যাবে না, সুস্থ থাকবে পশু পাখি, মানুষজন সহ সকল প্রাণীই। তাই, আমরা পারিবারিক কৃষি করবো এবং সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলবÑ জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ভূমিকা রাখবো।
মোছাঃ হুমায়েরা আক্তার
দশম শ্রেণী, বিজ্ঞান শাখা।
দিগদাইড় এম. এইচ. ইউনিহেল্প উচ্চ বিদ্যালয়