
নদী-নালা, খালবিলের দেশ বাংলাদেশ। ভাটির এদেশে রয়েছে হাজারো নদী। সেই নদীগুলোর রয়েছে বাহারি ও নান্দনিক সব নাম। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, গড়াই, ইছামতি, সোমেশ্বরী, তিতাস, কির্তনখোলা, নরসুন্দা,ময়ূরাক্ষী,মাতামুহুরী, খোয়াই, সুগন্ধা,পঞ্চবেণী, বিবিয়ানা,মানসের মতো আরও অসংখ্য নান্দনিক নাম সমৃদ্ধ নদী সমৃদ্ধ করেছে আমাদের অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যকে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গানে নদীগুলোর নান্দনিক উপস্থিতি বৈচিত্র দিয়েছে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে। বৈচিত্রময় তেমনি একটি নদীর নাম বাঙালি। হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত বাঙালি জাতির নামে বাংলাদেশের একমাত্র নদী বাঙালি। দামাল কিশোর-যুবকদের দুরন্তপনা ও মাঝি-মাল্লার হাকডাকে একসময় মুখরিত থাকতো বাঙালি নদী। নদী দিয়ে চলাচল করতো বাণিজ্যিক বড় বড় নৌকাসহ বিভিন্ন জলযান। নদীকেন্দ্রীক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল বাঙালি নদী। নাব্যতা হারিয়ে ফেলায় সে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভাটা পড়লেও এখনও বাঙালি নদী স্বনামে মহিয়ান। নদীকেন্দ্রীক কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে ঐতিহ্যবাহী নদীটি।
বাঙালি নদীর মূল উৎপত্তিন্থল নীলফামারি জেলার তিস্তা নদী । উর্ধভাগের সেই স্রোত ধারাটি ঘাঘোট নামে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাখালিতে পতিত হয়। সেখান থেকে শৌর্য-বীর্যের বাঙালি নাম ধারণ করে গাইবান্ধা জেলার আরেক উপজেলা সাঘাটায় প্রবেশ করে। এরপর দক্ষিণ দিকে বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলায় দু’টি জলধারায় বিভক্ত হয়ে যথাক্রমে সোনাতলা উপজেলার পৌর এলাকাধীন বিশুরপাড়া ও সোনাতলা উপজেলার সদর ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর দিয়ে বগুড়া জেলায় প্রবেশ করে। বাঙালি নামের জলধারা দু’টি সোনাতলা উপজেলার নানা বাঁক পেরিয়ে সারিয়াকান্দি উপজেলায় দুরন্তপনায় মেতে ওঠে। এখানে নদীটি ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রথম শাখা গাবতলি উপজেলার দুর্গাহাটা ইউনিয়ন, দ্বিতীয় শাখা গাবতলির বালিয়াদিঘী ইউনিয়ন এবং তৃতীয় শাখাটি ধুনট উপজেলায় প্রবেশ করে পুনরায় সারিয়াকান্দি উপজেলায় প্রবেশ করে। সারিয়াকান্দি থেকে নদীটি ধুনট উপজেলার দিকে দুই দিক দিয়ে দু’টি শাখায় অগ্রসর হয়। এর একটি ধুনটের নিমগাছি ইউনিয়ন ,চিকাশী ইউনিয়ন, ধুনট সদর হয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায় প্রবেশ করে যমুনার উপনদীর সাথে মিলিত হয়েছে। আর দ্বিতীয় শাখাটি ধুনট উপজেলার নিমগাছী ইউনিয়নের ধামগাছার পশ্চিম পাশ দিয়ে বগুড়া সদরে প্রবেশ করে। অতপর ধুনট উপজেলার এলাঙ্গী ইউনিয়নের বিলচাপরি হয়ে শেরপুর উপজেলার খামারখান্দি ইউনিয়ন, খানপুর ইউনিয়ন অতিক্রম করে বথুয়াবাড়ি নামক জায়গায় হলহলিয়া নদীর সাথে মিশে যায়।
বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বৃহত্তর রংপুর ও বগুড়া জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। বাঙালি অববাহিকায় আধিপত্য ছিল আন্দোলনকারী ফকির-সন্ন্যাসীদের । তাঁদের স্বদেশপ্রীতি বা বাঙালিয়ানা থেকে নদীটির নাম বাঙালি হতে পারে এ ধারণার বাইরে বাঙালি নদীর নাম নিয়ে আর কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তিস্তা ও যমুনা নদীর গতিপথের অস্তিত্ব ১৭৮৭ সালের আগে না পাওয়ায় ধারণা করা হয় বাঙালি নদীর জন্ম ১৭৮৭ সালের বন্যার পর। ১৮৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪৩ মিটার গড় প্রস্থের বাঙালি নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ জনপদ।