
পারুল একটি ফুলের নাম। কবি—সাহিত্যিকরা আদিকাল থেকেই কাব্য রচনা করে আসছেন পারুলকে নিয়ে। কবিতা, গান ও গল্পে আমরা প্রায়ই শুনে থাকি পারুলবন্দনা। কিন্তু পাটলী, পাটলা, অমোঘা, মধুদূতী, কৃষ্ণবৃন্তা, অম্বুবাসী, অলিপ্রিয়া বা বসন্তদূতী নামের গাছটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে রয়ে গেছে প্রায় অধরা। সুদূর অতীতে ভারতে এবং বঙ্গদেশে দু—একটি পারুল গাছ থাকলেও তা আজ বিলীন। তারপরেও জীববৈচিত্র্য রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলেছেন কয়েকজন গবেষক। যে কোনো মূল্যে হারিয়ে যাওয়া পারুলসহ সকল বিরল গাছকে উদ্ধার করতে হবে- এটিই তাঁদের ব্রত। গবেষকরা যখন সারা দেশ হন্যে হয়ে খঁুজে ফিরছেন পারুল নামের বৃক্ষটি, তখনি তাঁদের নজরে আসে পূর্ব বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার ছায়া—সুনিবিড়—বৃক্ষরাজিতে ভরা সরকারি নাজির আখতার কলেজের প্রবেশপথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পারুল প্রজাতির বিরল গাছটির প্রতি। প্রায় ৪০/৫০ ফুট উঁচু এ গাছটি সারা দেশেই বিরল বলে জানিয়েছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও বৃক্ষগবেষকরা।
গাছটির পৃষ্ঠদেশ কিছুটা ধূসর কালচে ধরনের। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ। পাতার আকার ৬ থেকে ৭ ইঞ্চি। শীতকালে গাছটির পাতা ঝরে যায়। এপ্রিল মাসে পুষ্প—পল্লবে সুশোভিত হয়ে ওঠে গাছটি। এ সময় সারা গাছে পাতার ফাঁকে ফাঁকে অজস্র সাদা সাদা ফুল ফোটে। গন্ধহীন সাদা ফুলগুলোর দৈর্ঘ্য ১ ইঞ্চির মতো। গাছটিতে প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা চিকন বাঁকানো ফল হয় । ফলগুলো শুষ্ক হয়ে ঝরে পড়ে। ফুলগুলোর তেমন গন্ধ অনুভূত না হলেও তাতে অজস্র ভ্রমরের গুঞ্জনে কলেজ চত্বরে অভাবনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জানা যায়, নাজির আখতার কলেজের জমিদাতা মরহুম সৈয়দ নুরুল হোদা প্রায় ৮০ বছর আগে তাঁর কর্মস্থল অবিভক্ত ভারতবর্ষের মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর থেকে দুটি চারা এনে তাঁর তৎকালীন বসতভিটায় রোপণ করেন। একটি মরে গেলেও অপর চারাটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে কালের মহাসাক্ষী। জানা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এ গাছতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের দু—একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী সময় কলেজকেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতি ও সংস্কৃতিচর্চার একটি বড় জায়গা হয়ে ওঠে গাছতলাটি।
স্থানীয়ভাবে সকলেই গাছটিকে পারুল বলে ডাকলেও কেউ জানতো না গাছটির মাহাত্ম্য। এ গাছটি যে সারা দেশের মধ্যেই বিরল সে বিষয়েও কারো তেমন ধারণা ছিল না। সত্তর দশকে দৈনিক সংবাদে ফুলবিষয়ক একটি লেখায় প্রকৃতিপ্রেমী ওয়াহিদুল হক ‘কোথায় গেল পারুল’ বলে মন্তব্য করেন। তখন অন্যান্য বৃক্ষপ্রেমী ও গবেষকরাও নেমে পড়েন অনুসন্ধানে।
‘Bignoniceae’ পরিবারভুক্ত (বর্তমান বৈজ্ঞানিক নাম Stereospermum cheloniodes, পূর্বের বৈজ্ঞানিক নাম Stereospermum suaveolens’) ইংরেজিতে ‘Trumpet’ নামের গাছটি ইতোমধ্যেই পর্যবেক্ষণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর আবুল হাসান। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ফুল—ফোটা অবস্থায় গাছটি পর্যবেক্ষণ করেছেন বৃক্ষপ্রেমী ও গবেষক, যশোর শিক্ষাবোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আমিরুল আলম খান। তিনি পরীক্ষার জন্য গাছটির পাতা, ফুল ও ফল ঢাকায় নিয়ে গিয়েছেন। তাঁর অভিমত, এটি হারিয়ে যাওয়া সেই পারুল। সরকারি আজিজুল হক কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক একেএম শফিকুর রহমানও গাছটি বিরল পারুল বলে জানিয়েছেন। বৃক্ষ নিয়ে সারা দেশ চষে বেড়ানো প্রফেসর আমিরুল আলম খানের ভাষ্য, এটি বাংলাদেশের একটি বিরল প্রজাতির গাছ। মূল পারুলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কিছুটা অমিল থাকলেও তাঁর মতে, গাছটি পারুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা গাছটির পাতা, ফুল ও ফল নিয়ে গবেষণা করছেন। তবে এ গাছটি বাংলাদেশের বিরল প্রজাতির গাছ তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাঁর মতে, টিস্যু কালচারের মাধ্যমে গাছটির বংশবৃদ্ধি করা দরকার। তিনি এ নিয়ে ‘পারুলের সন্ধানে’ নামক একটি গ্রন্থও লিখেছেন। তিনি বইটিতে লিখেছেন,‘ সারা বাংলাদেশে মূল পারুল না পেয়ে তিনি চলে যান পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে। উদ্দেশ্য, যেহেতু রবিঠাকুর পারুল নিয়ে অনেক গান ও কবিতা লিখেছেন, তাই তাঁরই হাতে গড়া দুষ্প্রাপ্য বৃক্ষরাজিতে—ভরা—শান্তিনিকেতনে যদি পারুলের সন্ধান পাওয়া যায়। শান্তিনিকেতনের উদ্যান আধিকারিক তাঁকে জানান, তারা নাকি আসমুদ্র হিমাচল চষে বেড়িয়েছেন পারুলের সন্ধানে। এ শূন্যতা পূরণে শান্তিনিকেতনের কাছাকাছি পারুলডাঙ্গায় অনুসন্ধান চালান তারা। তাদের ধারণা, যেহেতু জায়গার নাম পারুলডাঙ্গা তাই সেখানে গেলে নিশ্চয়ই পারুলের খেঁাজ পাওয়া যাবে। অনেক অনুসন্ধান করেও তারা হতাশ হন। এমনকি বাংলা—ইংরেজি পত্রিকায় এ নিয়ে বিজ্ঞাপনও প্রচার করা হয়। তাতে কেউ পারুলের অনুসন্ধান দিতে পারলে তার জন্য বড় ধরনের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।’
বিশ্বভারতী এখনো অব্যাহত রেখেছে পারুল অনুসন্ধান। তাঁর মতে, যদি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, সরকারি নাজির আখতার কলেজের বিরল গাছটিই পারুল গাছ, তবে তা এক বিরাট অর্জন বয়ে আনবে গোটা বাংলাদেশের জন্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. অপূর্ব রায় গাছটি পর্যবেক্ষণ করে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষার জন্য গাছটির ফুল, ডালপালা নিয়ে যান। তাঁরও অভিমত এটা উন্নত জাতের পারুল। গাছটি নিয়ে যখন এমন সরব আলোচনা তখন সোনাতলা উপজেলার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ হাবিবুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত রাজস্ব অফিসার ফেরদৌস আলম মুকুল ও আমি কলেজ কতৃর্পক্ষের অনুমতিসাপেক্ষে পারুল গাছটির নিচে প্রথমবারের মতো পারুলের বর্ণনা দিয়ে একটি বোর্ড লাগানোর ব্যবস্থা করি। আনন্দের কথা, স্থানীয় উৎসাহী কয়েকজন ব্যক্তি গাছটির বীজ থেকে কয়েকটি চারা উৎপাদন করেছেন। চারাগুলো এখনো সবল আছে। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও চলছে পারুল গাছটিকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা। গবেষণায় নিশ্চিত হতে পেরেছেÑ এটিই সেই কাক্সিক্ষত পারুল; তবে পারুলের বংশ বিস্তার কিভাবে ঘটানো যায় তা নিয়ে এখন গবেষণার কাজ চলছে। আশা করি, অচিরেই বেরিয়ে আসবে গাছটির আরো অজানা রহস্য। সেই উদ্ভাসিত আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে পুন্ড্র অঞ্চল তথা সমগ্র বাংলাদেশ।